বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোকে ঘিরে সোনা চোরাচালানের কৌশল দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। একসময় যাত্রীর লাগেজ কিংবা শরীরে সোনা লুকিয়ে আনার ঘটনা বেশি দেখা গেলেও এখন উড়োজাহাজের আসনের নিচে, টয়লেটের প্যানেল, কার্গো হোল্ড, কর্মীদের জুতা-বেল্ট কিংবা বিভিন্ন পণ্যের ভেতরেও বড় চালান পাওয়া যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, চোরাচালানকারীরা শুধু সোনা বহনের পদ্ধতিই বদলাচ্ছে না, রুট, বাহক এবং বিমানবন্দরের ভেতরে চালান সরানোর কৌশলেও পরিবর্তন আনছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে দেশে আসা সোনার পরিমাণ ও স্থানীয় চাহিদার ব্যবধান নিয়ে।
বাংলাদেশে নতুন সোনার বার্ষিক চাহিদা আনুমানিক ১৮ থেকে ৩৬ টন। অথচ শুধু ব্যাগেজ রুলসের আওতায় বৈধভাবেই অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি সোনা দেশে প্রবেশ করেছে। ২০২২ সালে এই পদ্ধতিতে প্রায় ৫৪ টন সোনা বাংলাদেশে আসে।
এর বাইরে বিমানবন্দরগুলোতে নিয়মিত অবৈধ চালানও জব্দ হচ্ছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও শুল্কসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, জব্দ হওয়া চালান মোট অবৈধ সোনা প্রবাহের খুব ছোট একটি অংশ।
এ কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—বাংলাদেশে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় এত বেশি সোনা আসছে কেন এবং শেষ পর্যন্ত এসব সোনা কোথায় যাচ্ছে।
বিভিন্ন তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে অনেক ক্ষেত্রে সোনা পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বৈধ কিংবা অবৈধ পথে দেশে প্রবেশ করা সোনার একটি অংশ পরে সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও শুল্কসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে।
ভারতে ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে সোনা আনার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কঠোরতা থাকায় বাংলাদেশ হয়ে সীমান্ত পার করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
বিশেষ করে যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় সোনা পাচারের ঘটনা নিয়মিত ধরা পড়ছে।এই প্রবাহের একটি অংশের উৎস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় পৌনে পাঁচ বছরে শুধু ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১ হাজার ৯৫৮ কেজি সোনা জব্দ হয়েছে।হিসাব করলে বছরে গড়ে প্রায় ৪১২ কেজি সোনা জব্দ হয়েছে।
তবে এই সংখ্যাকে দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করা মোট সোনার পরিমাণ হিসেবে ধরা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জব্দ হওয়া পরিমাণ মোট অবৈধ চালানের ১০ শতাংশেরও কম হতে পারে।
যদি এই ধারণা সঠিক হয়, তাহলে প্রকৃত সোনা পাচারের পরিমাণ জব্দের হিসাবের তুলনায় অনেক বড় হতে পারে।বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসা সোনার উৎস বিশ্লেষণেও একটি স্পষ্ট চিত্র দেখা যায়।ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে আসা সোনার প্রায় ৭৪ শতাংশ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে।
আরও ২০ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে।বাকি ৬ শতাংশ আসে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকংসহ অন্যান্য দেশ থেকে।এই হিসাব দেখায়, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রুট এখনো বাংলাদেশের সোনা চোরাচালানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
তবে কারবারিরা এখন সরাসরি একই রুট ব্যবহার না করে মাঝেমধ্যে শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড বা নেপালের মতো দেশ ঘুরে বাংলাদেশে প্রবেশের কৌশলও ব্যবহার করছে।
এতে যাত্রীর ভ্রমণ ইতিহাস আরও জটিল হয়ে যায় এবং গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ বাড়ে।সোনা পাচারের সবচেয়ে পুরোনো কৌশল হলো শরীরে লুকিয়ে বহন করা।
অনেক যাত্রী পায়ুপথে কিংবা শরীরের অন্য অংশে সোনা লুকিয়ে আনার চেষ্টা করেন। কখনো সোনাকে ছোট আকারে রূপান্তর করে ট্যাবলেটের মতো বানিয়েও বহন করা হয়েছে।
এই ধরনের ঘটনায় সন্দেহভাজন যাত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে শরীর থেকে সোনা বের করার নজিরও রয়েছে।তবে এখন চোরাচালানের কৌশল আরও জটিল হয়েছে।
সোনা গলিয়ে পেস্ট বা পাউডার তৈরি করা হচ্ছে। কখনো কাপড়ের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র, গৃহস্থালি সামগ্রী কিংবা পণ্যের চালানের ভেতরেও লুকিয়ে আনা হচ্ছে।
গত বছরের একটি ঘটনায় দুবাই হয়ে সিলেট থেকে ঢাকায় আসা এক যাত্রীর চার জোড়া অন্তর্বাস, ট্রাউজার ও তিনটি টি-শার্ট অস্বাভাবিক ভারী মনে হয়েছিল কাস্টমস কর্মকর্তাদের।
পরে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এসব কাপড় থেকে ২ দশমিক ৪১৭ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—সোনা এখন অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীর কাছেই রাখা হচ্ছে না।বরং উড়োজাহাজের ভেতর বিভিন্ন স্থানে চালান লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।
গত ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা আগে থেকেই বিমানটি নজরদারিতে রেখেছিলেন।
তল্লাশির সময় কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট প্যানেল খুলে সাদা কাপড়ে মোড়ানো ১৫৩টি সোনার বার পাওয়া যায়।বারগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ১৭ দশমিক ৮ কেজি এবং বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ কোটি টাকা।
এত বড় চালান জব্দ হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।এর তিন মাস পর, ২ জুলাই, একই ধরনের ঘটনা ঘটে।
দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১৪৮ ফ্লাইটের কার্গো হোল্ডে তল্লাশি চালিয়ে ১৬০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।
এসব বারের মোট ওজন ছিল ১৮ দশমিক ৭২ কেজি এবং বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।এই ঘটনাতেও কাউকে আটক করা যায়নি।
মাত্র ১৭ দিন পর, ১৯ জুলাই, হংকং থেকে আসা ক্যাথে প্যাসিফিকের একটি কার্গো উড়োজাহাজে প্রায় ১৬ কেজি সোনা পাওয়া যায়।
কাঠের ক্রেটে পণ্যের চালানের আড়ালে সেগুলো আনা হয়েছিল।বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।এ ক্ষেত্রেও কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।পরের বড় ঘটনাটি ঘটে ২ সেপ্টেম্বর।
ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড-৫২৩ ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণের পর তল্লাশি করে ১৯-এ নম্বর আসনের নিচে কালো স্কচ টেপে মোড়ানো অবস্থায় ৮০টি সোনার বার পাওয়া যায়।
মোট ওজন ছিল ৯ দশমিক ৩৩১ কেজি।এর মাত্র তিন দিন পর ৫ সেপ্টেম্বর আবারও দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আসা বিজি-১৪৮ ফ্লাইটে সোনার চালান পাওয়া যায়।
এবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক সহকারী টেকনিক্যাল হেল্পারের বেল্টের ভেতর থেকে ১২০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।সেগুলোর মোট ওজন ছিল ১৩ দশমিক ৯২ কেজি।
২১ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৫৮৫ ফ্লাইটে দীর্ঘ সময় তল্লাশি চালিয়ে উড়োজাহাজের টয়লেট থেকে ৫০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।
মোট ওজন ছিল ৫ দশমিক ৮৩২ কেজি এবং বাজারমূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা।
সর্বশেষ বড় ঘটনাটি ঘটে গত রবিবার।ভোরে দুবাই থেকে আসা এমিরেটসের ইকে-৫৮২ ফ্লাইট শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অভিযান চালায়।
সন্দেহভাজন দুই টেকনিক্যাল হেল্পারকে আটক করা হয়।তাঁদের জুতার ভেতর থেকে ৮০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।বারগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি এবং বাজারমূল্য প্রায় ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, উড়োজাহাজের ভেতর সোনা রেখে পরে সুবিধাজনক সময়ে অন্য কারও মাধ্যমে বের করে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই কৌশলের উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক যাত্রীকে সরাসরি সোনা নিয়ে কাস্টমস পার হওয়ার ঝুঁকি থেকে দূরে রাখা।
অর্থাৎ একজন যাত্রী কিংবা কুরিয়ার হয়তো শুধু উড়োজাহাজের ভেতরে সোনা রেখে যাবে, পরে বিমানবন্দর বা উড়োজাহাজসংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ব্যক্তি সুবিধাজনক সময়ে তা বের করে নেবে।
এই পদ্ধতিতে চোরাচালান পরিচালিত হলে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।কারণ সোনা পাওয়া গেলেও সরাসরি মালিক কিংবা বাহক শনাক্ত করা যায় না।সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় চালানে কাউকে আটক করতে না পারার ঘটনাও এই জটিলতাকে সামনে এনেছে।
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, শাহজালাল বিমানবন্দরে ২০২২ সালে প্রায় ৬৯৮ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছিল।
২০২৩ সালে জব্দ করা হয় ৫৫৫ কেজি।২০২৪ সালে পরিমাণ কমে ৪১৭ কেজিতে আসে।২০২৫ সালে জব্দ হয় ১৬৯ কেজি।আর চলতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে প্রায় ১১৯ কেজি সোনা জব্দ হয়েছে।
সংখ্যা কমার অর্থ অবশ্যই চোরাচালান কমে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।কারণ একই সময়ে চোরাচালানের পদ্ধতিও আরও জটিল ও গোপন হয়েছে।
বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সোনা চোরাচালানসংক্রান্ত ৫৪০টি মামলা হয়েছে।এই সংখ্যাও সমস্যাটির বিস্তৃতি বোঝাতে যথেষ্ট।বিমানকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও নতুন নয়।
২০১৪ সালে গোয়েন্দা পুলিশ বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক এমদাদ হোসেন, প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিংয়ের প্রধান ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ এবং শিডিউল ম্যানেজার তোজাম্মেল হোসেনসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল।
ওই তদন্তের পর বিমানের ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নজরদারিতে নেওয়ার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আরেক তদন্তেও তখন বিমানের ১৪ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।
এক যুগ পরও উড়োজাহাজের ভেতরে কিংবা বিমানকর্মীদের কাছ থেকে সোনা উদ্ধারের ঘটনায় সেই পুরোনো প্রশ্ন আবারও সামনে আসছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি ও নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সংস্থাটির অবস্থান স্পষ্ট।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ তল্লাশি চালিয়েও সোনা উদ্ধার করা হয়।
এ ধরনের তল্লাশিতে সাধারণত আসনের নিচে, টয়লেট, কার্গো হোল্ড কিংবা অন্যান্য লুকানো জায়গায় সোনা পাওয়া যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে কার্গোতে অন্য পণ্যের আড়ালেও সোনা আনার ঘটনা ধরা পড়েছে।কখনো ফল কিংবা অন্য পণ্য ঘোষণা করে ভেতরে সোনা লুকানো হয়েছে।আসামি আটক হলে ফৌজদারি মামলা করা হচ্ছে।
কার্গোর মাধ্যমে সোনা আনার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এজেন্টের লাইসেন্স বাতিলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চোরাচালানের মূল হোতাদের শনাক্ত করা।
বিমানবন্দরে যিনি সোনা বহন করছেন বা যিনি বিমান থেকে বের করছেন, তিনি অনেক সময় পুরো চক্রের খুব ছোট একটি অংশ।
এর পেছনে অর্থদাতা, আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী, স্থানীয় গ্রহণকারী এবং সীমান্তপারের নেটওয়ার্ক থাকতে পারে।এই পুরো কাঠামো ভাঙতে হলে শুধু বিমানবন্দরে সোনা আটক করাই যথেষ্ট নয়।
পরে সোনার গন্তব্য কোথায়, কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল এবং অর্থের লেনদেন কীভাবে হচ্ছে—এসবও অনুসরণ করা প্রয়োজন।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরও সোনা চোরাচালানের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ২৬২টি ঘটনায় প্রায় ১৬২ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় বাহক হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৯৭ জন পুরুষ এবং ৫৫ জন নারী।আর ১০টি চালান পাওয়া গেছে মালিকবিহীন অবস্থায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব বাহকের বেশির ভাগই সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছিলেন।সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও একাধিক বড় চালান ধরা পড়েছে।
২০১৬ সালের নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা একটি বিমানের আসনের নিচ থেকে ৮০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।সেগুলোর ওজন ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৩ কেজি।
২০১৮ সালে মাসকাটফেরত এক যাত্রীর লাগেজ থেকে ৬০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়, যার মোট ওজন ছিল প্রায় সাত কেজি।
আরও বড় চালান ধরা পড়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে।দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইটে শুল্ক গোয়েন্দারা ২৮০টি সোনার বার এবং ছয়টি সোনার ‘ডিম’ উদ্ধার করেন।মোট ওজন ছিল ৩৪ কেজির বেশি।এই ঘটনায় চার যাত্রীকে আটক করা হয়।
পরের বছর দুবাইফেরত এক যাত্রীর তিনটি জুসার-ব্লেন্ডারের ভেতর থেকে প্রায় ১৬ কেজি সোনা পাওয়া যায়।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শারজা থেকে আসা দুই যাত্রীর পোর্টেবল ফ্যান, রিচার্জেবল লাইটসহ বিভিন্ন সামগ্রীর ভেতর লুকানো অবস্থায় আরও সাড়ে ১৭ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, বাংলাদেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই সোনা চোরাচালানকারীদের নজরে রয়েছে।
তবে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর সবচেয়ে বড় রুট হিসেবে সামনে আসছে, কারণ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা, যাত্রীপ্রবাহ এবং কার্গো চলাচল এখানে সবচেয়ে বেশি।
সব মিলিয়ে সোনা চোরাচালানের বর্তমান চিত্র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে।
প্রথমত, দেশের বাস্তব চাহিদার তুলনায় বেশি সোনা আসার কারণ কী।
দ্বিতীয়ত, বৈধ ও অবৈধ পথে আসা অতিরিক্ত সোনার কতটা বাংলাদেশে থাকে এবং কতটা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে যায়।
তৃতীয়ত, বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ যদি চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে।
চতুর্থত, এত বড় বড় চালান ধরা পড়ার পরও যদি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল হোতা শনাক্ত করা না যায়, তাহলে শুধু জব্দের সংখ্যা বাড়িয়ে চোরাচালান বন্ধ করা কতটা সম্ভব।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে সোনা পাচারের চক্র কেবল কৌশল বদলাবে, কিন্তু থামবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই বিমানবন্দরের স্ক্যানিং ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন, কর্মীদের সম্পদ ও যোগাযোগ, কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সোনার গতিপথ—সবকিছু একসঙ্গে নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশ যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালানের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে সমস্যাটি কেবল বিমানবন্দরের নয়।
এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, আর্থিক অপরাধ এবং সংগঠিত অপরাধের একটি সমন্বিত চ্যালেঞ্জ।সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অন্তত এটুকু পরিষ্কার করেছে—চোরাচালানকারীরা নতুন কৌশল খুঁজে চলেছে।
একসময় যাত্রীর লাগেজে যে সোনা লুকানো হতো, এখন সেটি পাওয়া যাচ্ছে বিমানের টয়লেট, আসনের নিচে, কার্গো হোল্ড, কর্মীর বেল্ট, জুতা কিংবা পণ্যের ভেতরে।
অতএব লড়াইটিও শুধু বিমানবন্দরের গেটে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না।পুরো চক্রের অর্থ, মানুষ, রুট এবং গন্তব্য শনাক্ত করতে পারলেই এই ‘উড়ন্ত সোনার’ রহস্যের প্রকৃত সমাধান সম্ভব হবে।

