ঢাকার মেরুল বাড্ডায় মূল সড়ক ঘেঁষে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ১১ একর জমি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের দখলে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জমিটির বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। এ জমি নিয়ে পাঁচটি রিট মামলা হলেও ২১ বছরেও তার নিষ্পত্তি হয়নি। এর মধ্যে জমিকে কেন্দ্র করে প্রায় ছয় হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালের ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্টের ৯৩-এ ধারায় ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জমিটি অধিগ্রহণ করা হয়। তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাড্ডা মৌজায় এই ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এল এ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২-এর আদেশে ওই বছরের ২৫ এপ্রিল জমির দখল ডিআইটিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ডিআইটির অনুকূলে দখল হস্তান্তর সনদও দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধন করে ডিআইটির নাম বদলে রাজউক রাখা হয়।
জমির দখল ধরে রাখতে ২০০৫ সালে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেন। একই বছর রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা জমি দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালান। এতে ক্ষুব্ধ পক্ষ অভিযানের বিরুদ্ধে আবার হাইকোর্টে রিট করে। ২০০৭ সালে রিট করে মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও। এভাবে ধাপে ধাপে রাজউকের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি রিট হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জমিটি বেদখল থাকলেও তা উদ্ধারে রাজউকের আগ্রহ নেই। রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে উদ্ধারের তৎপরতা থমকে আছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে। জমিতে থাকা আড়ত থেকে প্রতি মাসে যে টাকা ওঠে, তার ভাগ এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী পান বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সপক্ষে প্রকাশ্য কোনো প্রমাণ বা তদন্ত প্রতিবেদনের কথা জানা যায়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়কের পাশে বাঁশের আড়ত, তার পরে মেরুল কাঁচাবাজার। সেখানে একটি ছোট টিনের ঘরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’-এর অফিস। আড়তের পাশে বড় একটি বস্তি গড়ে উঠেছে। জমির গা ঘেঁষে আছে ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ। জমিতে মাছ, মুরগি ও বাঁশের বড় আড়ত গড়ে তুলে রমরমা ব্যবসা চলছে।
রাজউক জমির মালিকানা দাবি করলেও সেখানে ব্যক্তিমালিকানার দাবিতে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। সাইনবোর্ডে জমির আমমোক্তার হিসেবে মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসের নাম আছে। দাগ নম্বর হিসেবে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯ এবং সিটি-১৫০০৯ লেখা। জমির মোট পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম এ বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অনেক রিট মামলা আছে। মামলা চালাতে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া আছে। রাজউকের অনেক কর্মকর্তা কাজ করতে চান না, কারণ কাজ না করলেই তাঁদের লাভ। এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।
এই জমিকে ঘিরে আরেকটি প্রতারণার অভিযোগও উঠেছে। ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করা মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য ধাপে ধাপে প্রায় ছয় হাজারে পৌঁছায়। সমিতির নামে জমির ১ একর ৮৯ শতাংশ বরাদ্দের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। ঘোষণা দেওয়া হয়, সেখানে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট হবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বল্পমূল্যে দোকান দেওয়া হবে। জমির মালিকানা নিয়ে আইনি অস্পষ্টতাকে পুঁজি করে একটি প্রভাবশালী চক্র এ কাজ করেছে বলে জমিতে থাকা এক মুদি দোকানি অভিযোগ করেন।
কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সদস্যরা দোকান পাননি। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থায়ী দোকানের আশায় প্রায় ছয় হাজার মানুষ জমানো সঞ্চয় সমিতিকে দেন। রসিদের মাধ্যমে ও নানা অজুহাতে দফায় দফায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা তোলা হয়। ২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির ও অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ এক নোটিসে মামলা খরচসহ অন্যান্য বাবদ সদস্যদের এককালীন এক হাজার টাকা দিতে বলেন। মৃত বা অন্যত্র চলে যাওয়া সদস্যের সদস্যপদ ওয়ারিশ বা অন্যের নামে হস্তান্তরের জন্য দুই হাজার টাকা করে চাওয়া হয়। এভাবে নানা সময়ে নোটিস দিয়ে বছরের পর বছর টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
২০০৫ সালে রাজউকের উচ্ছেদ অভিযানের সময় সমিতির কার্যক্রম থমকে যায়। সদস্যরা আতঙ্কে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তবে সমিতি কার্যালয় মেরুল বাড্ডা থেকে সরিয়ে মতিঝিলে নিয়ে যায় এবং রাজউকের আইনি জটিলতা কেটে যাবে, এমন আশ্বাস দিয়ে আবার চাঁদা ও কিস্তি আদায় চালিয়ে যায়, বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের দোকান হবে, এই আশায় তিনি সদস্য হয়েছিলেন। মাসে মাসে টাকা দিয়েছেন, কিন্তু ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। তাঁর দাবি, সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও। আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) জানান, ২০ বছরে তিনি প্রায় ৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। দোকান পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বুঝে কিস্তি বন্ধ করেছেন। কিন্তু জমানো টাকার কোনো হদিস নেই।
সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, সদস্যরা টানা ৩০ বছর চাঁদা দিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের ভাগ্য বদলায়নি। গত ১০ বছর সমিতির সব কার্যক্রম থমকে আছে। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকার লুটপাটের কথা বলেন। তাঁর দাবি, সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের এবং রাজউকের কাছে অর্থ দেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামের একটি পক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে। রাজউকের বক্তব্য, মামলা নিষ্পত্তি না হলে সমিতিকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে না। ২০০৫ সালে রোকন উদ-দৌলার উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার মামলাও করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, এই সমিতির পেছনের প্রভাবশালী চক্রকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। হারিয়ে যাওয়া ৩০০ কোটি টাকার হিসাব উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত ও তাঁদের উত্তরসূরিদের ফিরিয়ে দিতে হবে। বর্তমানে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে আইনি সহায়তা খুঁজছে।
ঘটনাটি দুটি আলাদা কিন্তু সম্পর্কিত সমস্যা সামনে এনেছে। প্রথমত, সরকারি সম্পত্তি দখল ও তা উদ্ধারে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তা। দ্বিতীয়ত, জমির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতার সুযোগে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় আত্মসাতের অভিযোগ। রাজউক চেয়ারম্যানের নিজের বক্তব্যই ভেতরের কিছু কর্মকর্তার অনীহার ইঙ্গিত দেয়। তবে কারা, কীভাবে এর সঙ্গে জড়িত, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। পাঁচটি রিট কেন ২১ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ৩০০ কোটি টাকার হিসাব কোথাও যাচাই করা হয়েছে কি না এবং কোনো তদন্ত বা মামলা হয়েছে কি না, তাও জানা যায়নি। সাইনবোর্ডে যাঁদের নাম আছে বা সমিতির সাবেক নেতাদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে নেই। এসব অভিযোগ মূলত ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের বক্তব্যনির্ভর।
এখন নজর থাকবে রাজউক আদালতে রিটগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে কী উদ্যোগ নেয়, সেদিকে। দুর্নীতি দমন কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থা তদন্তে নামে কি না, সেটিও দেখার বিষয়। এই জমি উদ্ধার না হলে একদিকে সরকারের বিপুল সম্পদ অন্যের দখলে থাকবে, অন্যদিকে প্রতারিত মানুষের টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ থেকে যাবে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ

