রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে কার্যালয়ে হেনস্তা করে কাগজে সই করিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় আবদুস সালাম নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি রাজশাহী মহানগরের রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। গত আগস্টে ওই কমিটি স্থগিত করা হয়েছিল।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে মামলাটি করেন উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার (অর্থ) মো. নাজমুল হোসাইন। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, সরঞ্জাম চুরি ও ভাঙচুরসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. গাজিউর রহমান আজ বুধবার জানান, ঘটনাস্থলের ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হবে বলে তিনি জানান।
ঘটনার সূত্রপাত গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্যের কক্ষে ঢুকে একদল লোক তাঁকে একটি কাগজে সই করতে বাধ্য করে বলে অভিযোগ ওঠে। উপাচার্যের দাবি, কাগজটি তাঁকে পড়তে দেওয়া হয়নি। সই না করলে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে পারেন, এমন আশঙ্কায় তিনি সই করেন। তাঁর ধারণা, কাগজটি ছিল পদত্যাগপত্র।
বিকেলে গেস্ট হাউসের সামনে সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য বলেন, ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল তাঁর কক্ষে ঢুকে চেয়ার ছেড়ে চলে যেতে বলে। দলটির সদস্যরা তাঁকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দেয় এবং বলে, তাঁকে আর ওই চেয়ারে দেখতে চায় না। এরপর তাঁর সামনে একটি কাগজ দিয়ে সই করতে বলা হয়। সই করার পর কাগজটি নিয়ে তাঁকে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়। ঘটনার পর থেকে অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্যের দপ্তরে তালা ঝুলছে।
ঘটনাটি একাধিক গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানকে কার্যালয়ে ঢুকে চাপ দিয়ে সই করানো শুধু ব্যক্তিগত হেনস্তা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপরও আঘাত। কাউকে পদ থেকে সরাতে হলে আইনি ও বিধিবদ্ধ পথ রয়েছে। জোর করে নেওয়া সই সেই প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না। উপাচার্যকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বলার অভিযোগও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনিক পদ থেকে সরানোর প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত দেয়। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য এখনো জানা যায়নি।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে তিনি ঘটনার সময় ঠিক কী ভূমিকায় ছিলেন এবং সেই কমিটি স্থগিত থাকার সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগ আছে কি না, তা পুলিশ বা অন্য কোনো সূত্র থেকে স্পষ্ট নয়। এসব তথ্য তদন্তেই বেরিয়ে আসবে। অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে দোষী বলা যাবে না।
আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সই করানো কাগজটি আসলেই পদত্যাগপত্র ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। কাগজটি এখন কার কাছে আছে এবং তার আইনি মূল্য কী, সে বিষয়েও কিছু জানা যায়নি। সরঞ্জাম চুরি ও ভাঙচুরের পরিমাণ কত, তাও স্পষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম এখন কীভাবে চলছে এবং উপাচার্য দপ্তরে ফিরবেন কি না, সে তথ্যও পাওয়া যায়নি।
এখন নজর থাকবে বাকি আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার হয় কি না, সেদিকে। ভিডিও বিশ্লেষণে কারা জড়িত ছিলেন এবং ঘটনার পেছনে কোনো সংগঠিত পরিকল্পনা ছিল কি না, তাও তদন্তে স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উপাচার্যের পদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও দেখার বিষয়।

