কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৪) হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থলে ভয়াবহ ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। জগতপুর এলাকার নির্জন সড়কের দুই পাশে অন্তত চার-পাঁচটি ধানক্ষেতে ছোটাছুটি ও টানাহেঁচড়ার দাগ দেখা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, কিশোরী নিজেকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছিল। বৃহস্পতিবার সকালে একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, জগতপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া পাকা সড়কটি নির্জন। সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। সড়কের মাঝামাঝি অংশে দুই পাশের কয়েকটি ক্ষেতের ধানগাছ এলোমেলো হয়ে আছে, কোথাও মাড়ানো, কোথাও ভাঙা। দেখে মনে হয়, কেউ প্রাণভয়ে একের পর এক ক্ষেত পেরিয়ে ছুটে পালানোর চেষ্টা করেছে। সড়কের এক পাশের ধানক্ষেতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা উল্টানো বা কাত অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে স্থানীয়রা সেটি টেনে সড়কে তোলেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, সকালে আশপাশের লোকজনের কাছে তিনি শোনেন, ধানক্ষেতে একটি সিএনজি পড়ে আছে। খবর পেয়ে গিয়ে দেখেন, কথা সত্য। সিএনজি থেকে বিশ-ত্রিশ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। এরপর ধস্তাধস্তির চিহ্ন ধরে কিছুটা এগিয়ে তিনি ধানক্ষেতে কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান। তাঁর বর্ণনায়, গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। মরদেহ দেখতে মানুষ ভিড় করতে শুরু করলে তিনি একটি গামছা দিয়ে মরদেহ ঢেকে দেন এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
আরেক বাসিন্দা মুহিন বলেন, যাঁরা মেয়েটিকে মেরেছে, তারা তাকে অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে, ধানক্ষেতের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। তাঁর ধারণা, মেয়েটি বাঁচার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পেরে ওঠেনি। একই সঙ্গে তিনি একটি প্রশ্নও তোলেন। সিএনজিটি কেন ওভাবে ধানক্ষেতে পড়ে ছিল? যদি সেটি হত্যাকারীদের হয়ে থাকে, তবে তারা সেটি ফেলে গেল কেন এবং কীভাবে ঘটনাস্থল ছেড়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি পুলিশি তদন্তের কাছ থেকেই আশা করছেন।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, নিহতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। গলায় গামছা পেঁচানো থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে এলেই হত্যার সুনির্দিষ্ট বিবরণ জানা যাবে।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, জব্দ করা অটোরিকশাটি নিবন্ধিত। সেটির সূত্র ধরেই তদন্ত এগোচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর স্কুলে যায়নি। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করেন। পরিবারটি কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত। ঘটনার পর বাবা বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন।
ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে স্বজনেরা মরদেহ নিয়ে কুমিল্লা থেকে যশোরের উদ্দেশে রওনা হন। যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলায় নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে কিশোরীকে দাফন করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ঘটনাস্থলের চিত্র বলছে, এটি আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা নয়। একাধিক ক্ষেতজুড়ে ধস্তাধস্তির দাগ দেখে বোঝা যায়, কিশোরীকে ধাওয়া করা হয়েছিল এবং সে বারবার পালানোর চেষ্টা করেছে। ধানক্ষেতে একটি নিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশা পড়ে থাকা তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। নিবন্ধন নম্বর ধরে গাড়ির মালিক, চালক ও সেটি সর্বশেষ কার কাছে ছিল, তা শনাক্ত করা গেলে তদন্ত অনেকটা এগিয়ে যেতে পারে। তবে স্থানীয়দের তোলা প্রশ্নও অমূলক নয়। হত্যাকারীরা যদি ওই গাড়িতেই এসে থাকে, তবে সেটি ফেলে কীভাবে সরে গেল, তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। আশপাশের সড়কের সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়েও এখন পর্যন্ত যা বলা হচ্ছে, তা পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকা এবং গলায় গামছা পেঁচানোর ভিত্তিতে শ্বাসরোধে হত্যার সন্দেহ করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বিশেষ করে একজন নাবালিকার মৃত্যুর ঘটনায় গুজব বা অনুমানভিত্তিক তথ্য ছড়ানো পরিবারের জন্য বাড়তি যন্ত্রণার কারণ হতে পারে।
কিশোরীর স্কুলে না যাওয়ার তথ্যটিও স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে সে কেন স্কুলে যায়নি, তা এখনো জানা যায়নি। এই তথ্যের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। পুলিশ সব দিক খতিয়ে দেখলেও অনুমানের ভিত্তিতে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকে দায়ী করার সুযোগ নেই।
ঘটনাটি আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে। গ্রামাঞ্চল ও শহরতলির নির্জন সড়কে বিশেষ করে রাতে কিশোরী ও নারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? রাতের বেলা সড়কে টহল, জরুরি সেবার দ্রুত সাড়া এবং সড়কে নজরদারির ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের অপরাধ ঘটানো সহজ হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে এগিয়ে নেওয়াও জরুরি, যাতে অপরাধীরা শনাক্ত হয় এবং শাস্তি পায়।
এখন সবার নজর পুলিশি তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের দিকে। অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করা গেলে পরিবারের পাশাপাশি এলাকাবাসীও কিছুটা স্বস্তি পাবে। আর তদন্তে কত দ্রুত ও কতটা নির্ভরযোগ্য অগ্রগতি আসে, সেটিই ঠিক করবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে মানুষের আস্থা কোন দিকে যায়।

