বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে সরকারি অডিট প্রতিবেদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কার্যক্রম যাচাই করে অডিটে মোট ৭৯টি আপত্তি শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে অনিয়ম, আর্থিক ক্ষতি ও ঝুঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬১ কোটি টাকা।
কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অডিট বছরের আওতায় পরিচালিত এই পর্যালোচনায় ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এছাড়া আরও ৫০টি পর্যবেক্ষণে প্রায় ১২১ কোটি টাকার আর্থিক ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে অনুমোদন ছাড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে। এতে বলা হয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই পণ্য ক্রয় ও অবকাঠামো নির্মাণ কাজে বিএমডিএ প্রায় ১০৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।
এই অর্থের মধ্যে ১২টি লটে নয়টি দরপত্রের মাধ্যমে পিভিসি পাইপ কেনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এছাড়া ভূগর্ভস্থ সেচ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও ড্রিপ সেচ চালুর প্রকল্পের আওতায় ২৫০ মিলিমিটার ব্যাসের পিভিসি পাইপ স্থাপনে ৬৬টি লটের মাধ্যমে আরও প্রায় ৫৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে।
অডিট কর্তৃপক্ষের মতে, এসব ব্যয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০০৮-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিএমডিএ জানিয়েছে, প্রকল্প কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। তবে অডিট কর্তৃপক্ষ তাদের এই জবাবকে পর্যাপ্ত মনে করেনি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিএমডিএ ২২টি বেসরকারি ব্যাংকে প্রায় ২৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখেছে। এর মধ্যে নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় ৮৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা বেশি রাখা হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএমডিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেশি সুদের সুবিধা পাওয়ার জন্য এবং প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকে অর্থ রাখা হয়েছে। তবে অডিট কর্তৃপক্ষ এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। তাদের মতে, কিছু আমানত এমন ব্যাংকে রাখা হয়েছে যেগুলোর আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে। এ বিষয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অডিটে আরও একটি বড় আর্থিক ক্ষতির বিষয় উঠে এসেছে। বিএমডিএ অ-ক্যাপিটাল আয়ের ওপর নির্ধারিত হারে আয়কর না কাটায় সরকারের প্রায় ৬৫ কোটি ২৪ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এছাড়া শেষ হওয়া প্রকল্পের অব্যবহৃত প্রায় ৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়নি বলেও অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। দুটি প্রকল্পে এইচডিপিই পাইপ কেনা ও স্থাপনে মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের চেয়ে প্রায় ১৩ কোটি ৪ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এছাড়া একটি কাজকে পাঁচটির বেশি লটে ভাগ করে প্রায় ২৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা সরকারি ক্রয় নীতিমালার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে অডিট। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকা একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে এমন কিছু লেনদেনের কথাও বলা হয়েছে, যেগুলো শুধু বরাদ্দের অর্থ শেষ করার উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন বিএমডিএ একটি প্রকল্পের চতুর্থ কিস্তিতে ছাড় হওয়া ৪০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার মধ্যে ৬২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ১৩৯টি বিল পরিশোধ করেছে।
আরেকটি ঘটনায় দেখা গেছে, কোনো ধরনের বাস্তব অগ্রগতি না থাকলেও প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকার প্রথম চলতি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
ক্রয় প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের ইঙ্গিত পেয়েছে অডিট দল। চারটি দরপত্রে দেওয়া কোটেশন একই হাতের লেখায় লেখা বলে সন্দেহ করা হয়েছে। একই স্থানে পরিচালিত দুটি পাইল লোড পরীক্ষার জন্য আলাদা অর্থ পরিশোধের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এছাড়া একটি সম্পন্ন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৮৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলেও তা প্রায় দুই বছর ধরে গুদামে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এর ফলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং কৃষকরাও প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে শুধু অর্থ বরাদ্দ নয়, স্বচ্ছতা, পরিকল্পনা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৃষি ও সেচভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনিয়ম হলে এর প্রভাব সরাসরি কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
অডিট কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে অর্থ ফেরত নেওয়া, দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর করার সুপারিশ করেছে। এখন বিএমডিএ এসব আপত্তির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।

