কুমিল্লার লালমাইয়ে স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমীনকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের তথ্য জানিয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত কিশোরীর মোবাইল ফোন ও ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ধর্ষণের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছে পুলিশ।
আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিং করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। তিনি জানান, গত ৮ অক্টোবর লালমাই উপজেলার জগতপুর চরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা হওয়ার পর পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। এর একপর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নিহত তাজমীন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তাঁর গ্রামের বাড়ি যশোরে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারসহ কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় থাকত সে।
পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্সের বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমীন। চালক প্রথমে ৫০০ টাকা ভাড়া চাইলেও শেষ পর্যন্ত ৩০০ টাকায় রাজি হন। পথে একটি দোকান থেকে রুটি ও কলা কিনে আনতে চালককে ১০০ টাকা দেয় কিশোরী। এরপর তারা আবার রওনা হয়।
কিছু দূর যাওয়ার পর শর্টকাটে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নূরজাহান হোটেলের সামনে দিয়ে ইউটার্ন নেয় চালক। সে অটোরিকশা চাঁদপুর রোডের দিকে নিয়ে যায়। বিজরা বাজার হয়ে নির্জন একটি স্থানে পৌঁছে হঠাৎ ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। জায়গাটি চিনতে না পেরে তাজমীন প্রশ্ন করলে চালক জানায়, এটি রেসকোর্স নয়। বিপদ আঁচ করে কিশোরী অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে।
পুলিশের ভাষ্য, চালক তাকে আটকাতে গেলে তাজমীন চিৎকার শুরু করে। তখন গামছা দিয়ে তাঁর গলা পেঁচিয়ে ধরা হয় এবং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে কিশোরী দুর্বল হয়ে পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদে সুমন দাবি করেছে, এরপর সে কিশোরীকে ধর্ষণ করে এবং পরে ধানক্ষেতে নিয়ে গিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এসব বিবরণ অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পুলিশ জানিয়েছে।
হত্যার পর অভিযুক্ত কিশোরীর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে নেয় এবং ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলেই ফেলে রেখে সে কাঁচিকাটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করে। এরপর অন্য একটি ভাড়ায়চালিত অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় যায়। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রেখে সে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায়।
গ্রেপ্তারের পর সুমনের দেওয়া তথ্যে বাখরাবাদের ওই জঙ্গল থেকে আইফোনটি এবং ধানক্ষেত থেকে ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ঘটনার বিবরণ দিয়েছে এবং নিজের দোষ স্বীকার করেছে।
ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ বড়ুয়া আরও কিছু তথ্য দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমীন বাবার কাছে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল। বাবা সেটি তৎক্ষণাৎ দেখতে পাননি। ভোরের দিকে লোকেশন দেখে তিনি ওই এলাকায় খুঁজতে যান। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, বিপদের মুহূর্তে কিশোরী সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করেছিল। সময়মতো বার্তাটি নজরে এলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত কি না, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ কোনো মন্তব্য করেনি।
ঘটনাস্থল থেকে আধা কিলোমিটার দূরের একটি সিসিটিভি ফুটেজও পুলিশের হাতে এসেছে। তাতে তাজমীনকে অটোরিকশায় শান্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়। অটোরিকশায় অন্য কেউ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত শুধু চালক সুমনের সংশ্লিষ্টতাই পেয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, তাজমীন ৪ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ ছিল। অথচ পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগ করা হয়নি। ওই কয়েক দিন সে কোথায় ও কার সঙ্গে ছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ। ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর অযাচিত সন্দেহ বা ভুক্তভোগীর দিকে আঙুল তোলার প্রবণতা এড়িয়ে তথ্যের নিশ্চিত প্রমাণের অপেক্ষা করাই এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল অবস্থান।
ধর্ষণের বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি থাকলেও বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া দামি আইফোনটি পরিবার কিনে দিয়েছিল কি না, তা যাচাই করতে তাজমীনের বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এই ঘটনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, পুলিশের হাতে থাকা স্বীকারোক্তি তদন্তে সহায়ক হলেও বিচারের ক্ষেত্রে এককভাবে যথেষ্ট নয়। ফরেনসিক প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার করা আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ একসঙ্গে মিলিয়েই মামলার ভিত্তি শক্ত হবে। তাই তদন্তের প্রতিটি ধাপ নির্ভুল ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, গভীর রাতে একজন কিশোরীর একা যানবাহনে চলাচলের ঝুঁকি আবারও সামনে এসেছে। নগরীর প্রবেশপথ ও মহাসড়কের আশপাশে রাতে নিরাপদ গণপরিবহন, নিবন্ধিত চালক এবং যানবাহনের তথ্য রাখার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সে প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠেছে। লাইভ লোকেশন ও সিসিটিভির মতো প্রযুক্তি তদন্তে সাহায্য করেছে, কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধে এগুলোর ভূমিকা সীমিত। প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন সক্রিয় টহল ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা।
তৃতীয়ত, শিশু-কিশোরের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার ও কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ডায়েরি করা হয়নি বলে পুলিশ যে তথ্য দিয়েছে, তা তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই হবে। তবে এর আগে কোনো পক্ষকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই।
আপাতত সবার নজর ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং মামলার পরবর্তী অগ্রগতির দিকে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি উঠছে। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে ঠেকাতে নিরাপদ চলাচল ও দ্রুত সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদও জোরালো হচ্ছে।

