অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী রেহেনা পারভীনকে হত্যার অভিযোগে তাঁর স্বামী আওলাদ হোসেনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে পুলিশের দাবি, রেহেনাকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। জায়গাটি আড়াল করতে সেখানে সবজির চারা লাগানো হয়েছিল।
প্রায় দুই মাস পর আশুলিয়ায় আওলাদের বোন পাপিয়া আক্তারের বাড়ির সামনে থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে দাঁত থেকে পাওয়া ডিএনএ পরীক্ষায় মরদেহের সঙ্গে রেহেনার মায়ের জৈবিক সম্পর্কের মিল পাওয়া যায়।
পুলিশের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ জুলাই চিকিৎসার কথা বলে রেহেনাকে নবাবগঞ্জের ছোট রাজপাড়া থেকে আশুলিয়ার একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরে কয়েকজন মিলে রেহেনার হাত ও পা চেপে ধরেন। আওলাদ তাঁর মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, সেদিন রাতেই মরদেহটি পাপিয়ার বাড়ির সামনে সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটিচাপা দেওয়া হয়। পরে মরদেহের ওপর সবজির চারা লাগানো হয়।
বাংলাদেশে এসে নিখোঁজ
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ জুন ১৩ বছর বয়সী মেয়ে আহাদ নূরকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন রেহেনা। ৩০ জুন স্বামী আওলাদ তাঁকে ও মেয়েকে নবাবগঞ্জের ছোট রাজপাড়ায় নিয়ে যান।
৩ জুলাই রেহেনা তাঁর মাকে ফোন করে জানান, তাঁকে মারধর করা হয়েছে। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ১৩ জুলাই আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। তবে রেহেনা নির্ধারিত সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাননি।
পুলিশের অভিযোগ, চিকিৎসার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে রেহেনাকে আশুলিয়ার নয়ারহাট চৌরাপাড়া এলাকায় পাপিয়ার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
মাটির নিচে মিলল মরদেহ
তদন্তের সময় আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার কুরগাঁও মনোদিয়া চৌরাপাড়া এলাকা থেকে রেহেনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, মরদেহটি পাপিয়ার বাড়ির সামনে সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটির নিচে ছিল। পরদিন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তানভীর হাসান খান অভিযোগপত্রে মরদেহ উদ্ধার, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা, ফরেনসিক প্রতিবেদন, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার করা মরদেহের দাঁত থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইল রেহেনার মা আইরিন আক্তারের সঙ্গে জৈবিক সম্পর্কের মিল রয়েছে।
আসামি পাঁচজন
মামলার অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে আওলাদ হোসেন, তাঁর দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম, চাচাতো ভাই কবির হোসেন এবং দূর সম্পর্কের চাচা সহকারী আমজাদ হোসেনকে।
আওলাদ ছাড়া অন্য চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আওলাদ ঘটনার পর ২০২৪ সালের ১১ জুলাই অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তাঁকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়।
২০২৫ সালের ২৫ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়। পুলিশ জানায়, আওলাদ অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ হেফাজতে আছেন।
আদালতে জবানবন্দি
মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের একজন রেহেনার ১৩ বছর বয়সী মেয়ে আহাদ নূর। সে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, জবানবন্দিতে সে মায়ের ওপর নির্যাতন এবং ঘটনার আগে ও পরের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে।
পুলিশ আরও বলেছে, আমজাদ হোসেন ও কবির হোসেন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তাঁরা হত্যাকাণ্ডে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় মোট ২৪ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রেহেনার মা, স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ কর্মকর্তা এবং চিকিৎসক রয়েছেন।
মায়ের আপত্তি
রেহেনার মা ও মামলার বাদী আইরিন আক্তার বর্তমানে চোখের চিকিৎসার জন্য ভারতে রয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, তিনি আপত্তি জানালেও পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে।
আইরিনের আইনজীবী আদালতে নারাজি আবেদন করেছেন। অভিযোগপত্রের বিষয়ে আদালতে শুনানিও হওয়ার কথা রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তানভীর হাসান খান বলেন, মামলার ফলাফল ও তথ্যপ্রমাণ যাচাইয়ের জন্য নিয়ম অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নথি পাঠানো হয়েছিল। বাদী বিদেশে থাকায় তাঁকে ফোনে মামলার ফল জানানো হয়।
তাঁকে জানানো হয়েছিল, সিদ্ধান্তে আপত্তি থাকলে তিনি নারাজি আবেদন অথবা পুনঃতদন্তের আবেদন করতে পারবেন।
অস্ট্রেলিয়াতেও আওলাদের বিরুদ্ধে মামলা
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, গত ২২ সেপ্টেম্বর ব্রিসবেন থেকে আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ।
তাঁর বাসায় তল্লাশি চালিয়ে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের অভিযোগ, একটি বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুস দেওয়ার চেষ্টা করেছেন আওলাদ। তদন্তকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে গত দুই বছরে তিনি বাংলাদেশে ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি পাঠিয়েছেন বলেও পুলিশের অভিযোগ।
তবে তদন্তকারীরা বলেছেন, এই অর্থ লেনদেনের কারণে চলমান তদন্তের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আওলাদ বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর আইনজীবী অভিযোগ অস্বীকার করে জামিনের আবেদন করবেন বলে জানানো হয়েছে।
আদালতে পরবর্তী শুনানি
রেহেনা নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পাঁচ দিন পর ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর মা আইরিন আক্তার নবাবগঞ্জ থানায় মামলা করেন। এর আগে একই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।
তদন্ত শেষে গত ৩১ আগস্ট ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তানভীর হাসান খান।
গত ২১ সেপ্টেম্বর আদালত অভিযোগপত্রটি পর্যালোচনা করেন। পরবর্তী পর্যালোচনার জন্য ২২ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছে।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ও ৩০ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে অভিযোগপত্রে থাকা অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। মামলার বিচার ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই আসামিদের দায় নির্ধারিত হবে।

