রাসেল মিয়াকে হত্যার পর প্রায় দেড় বছর স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করছিলেন তাঁর বন্ধু কালু মিয়া। আশপাশের মানুষও তাঁকে দেখে সন্দেহ করেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি।
গ্রেপ্তারের পর প্রথমে হত্যার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছিলেন কালু। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানেই নাকি বদলে যায় তাঁর আচরণ।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, কারাগারে থাকার সময় কালু ঘুমাতে পারছিলেন না। বারবার নিহত বন্ধু রাসেলের কথা মনে পড়ত। একপর্যায়ে তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান, রাসেলের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা তিনি বলতে চান। পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যার ঘটনা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
ঘটনাটি জামালপুরের সরিষাবাড়ীর। ২০২৫ সালের ২০ মার্চ স্থানীয় একটি চায়ের দোকান থেকে রাসেল মিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। শুরুতে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও তদন্তে নানা অসংগতি ধরা পড়ে।
বন্ধুত্ব থেকে হত্যার ঘটনায়
রাসেল একটি হোটেলে কাজ করতেন। কালুও দোকানের কর্মচারী ছিলেন। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, রাসেলসহ কয়েকজন সোহেল নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার নিতেন। তাঁদের জুয়া খেলার অভ্যাসও ছিল।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সুমন আহমেদের ভাষ্য, রাসেলের কাছে সোহেলের ৩৫ হাজার টাকা পাওনা ছিল। সেই টাকা ফেরত দিতে তাঁকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছিল। হত্যার আগের দিনও টাকা না দিলে রাসেলকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ সোহেল তাঁর এক বন্ধুর মাধ্যমে রাসেলকে একটি নির্জন জায়গায় ডেকে নেন। সেখানে কালুসহ আরও দুজন ছিলেন।
পিবিআই বলছে, সেখানে রাসেলের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তাঁকে জোর করে মদ খাওয়ানো হয়। পরে তাঁর মুখে কাপড় গুঁজে এবং পায়ুপথে মদের বোতল ঢুকিয়ে নির্যাতন করা হয় বলে তদন্তে জানা গেছে। একপর্যায়ে রাসেল নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
এরপর ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে পিবিআইয়ের দাবি। রাসেলকে অচেতন অবস্থায় সরিষাবাড়ীর আরামনগর বাজারের হাফিজুর রহমানের চায়ের দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাঁশের ধরনার সঙ্গে গলায় রশি দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পরে জড়িত ব্যক্তিরা চলে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
মায়ের মামলা, পরে পিবিআই তদন্ত
রাসেলের মা মেহেনারা খাতুন ২১ মার্চ সরিষাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় তখন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।
থানা পুলিশ তদন্ত করে সোহেলকে গ্রেপ্তার করেছিল। তবে তাঁর কাছ থেকে হত্যার বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানায়। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন। থানা পুলিশের তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
তদন্তের একপর্যায়ে কালুর সম্পৃক্ততার তথ্য পান পিবিআই কর্মকর্তারা। গত ১১ আগস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে শুরুতে তিনি হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।
পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাঁকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তখনই নিজের অবস্থান বদলান কালু।
বন্ধুর মৃত্যুর কথা বলতেন বারবার
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, রিমান্ডে কালু জানান, কারাগারে থাকার সময় তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারছিলেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বারবার রাসেলের কথা মনে পড়ত এবং তাঁকে সত্য ঘটনা পুলিশকে জানানোর জন্য মানসিকভাবে চাপ অনুভব করতেন।
এরপর তিনি হত্যার ঘটনা খুলে বলেন। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, কালুর বক্তব্যের পর রাসেল হত্যার রহস্য অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে। মামলার তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এ ঘটনায় শনাক্ত হওয়া আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। মামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে তদন্তে উঠে আসা সোহেল বর্তমানে জামিনে আছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোহেলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা রয়েছে।
তবে তদন্তে যেসব অভিযোগ ও তথ্য উঠে এসেছে, সেগুলো এখনো আদালতে বিচারাধীন। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো আসামিকে আইনগতভাবে দোষী বলা যায় না।

