একটি প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অর্থ উত্তোলন এবং সেই অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তরের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ করেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়েছিল। এ ঘটনায় সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সংস্থাটি।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিন দফায় এই ঋণ অনুমোদন করা হয়। অনুমোদিত ৫৪৫ কোটি টাকার মধ্যে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ বা উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে এক দিনেই সর্বোচ্চ ২৩০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
মামলায় সালমান এফ রহমান ছাড়াও আসামি করা হয়েছে তার ছেলে ও আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ সায়ান ফজলুর রহমান, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল-মনজুর এবং পরিচালক ইশরাত জাহান লাইজুসহ ব্যাংকের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের।
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা, আর্থিক অবস্থা, আগের ঋণের ব্যবহার এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকিং নিয়মনীতি অনুসরণ না করেই ঋণের সীমা বাড়ানো এবং অর্থ ছাড় করা হয়েছে।
তিন ধাপে বাড়ে ঋণের পরিমাণ
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে প্রথমে ৯০ কোটি টাকার ওভারড্রাফট ঋণ অনুমোদন করা হয়।
এরপর ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি ঋণের সীমা বাড়িয়ে ১৪৫ কোটি টাকা করা হয়। দুদকের অভিযোগ, আগের ঋণের ব্যবহার ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই না করেই এই ঋণ বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়।
ঋণের সীমা বাড়ানোর পর ২০২৩ সালের ১২, ১৫ ও ১৭ জানুয়ারি তিন দিনে নগদে ৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২৫ জুন আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ঋণের সীমা আরও বাড়িয়ে ৫৪৫ কোটি টাকা করা হয়।
দুদকের দাবি, এই বর্ধিত ঋণের প্রায় পুরো অর্থ মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে উত্তোলন করা হয়। ২০২৪ সালের ২৭ ও ৩০ জুন এবং ৩ ও ৭ জুলাই—এই চার দিনে নগদে ৩৯৪ কোটি টাকা এবং পে-অর্ডারের মাধ্যমে আরও ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮২ টাকা উত্তোলন করা হয়।
অর্থাৎ চার কার্যদিবসে মোট ৩৯৫ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮২ টাকা বিতরণ বা উত্তোলন করা হয়েছে বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থ কোথায় গেছে, তা নিয়েও অভিযোগ
দুদকের অভিযোগ, স্কাইমার্কের নামে নেওয়া ঋণের অর্থ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হয়নি। বরং অর্থের উৎস ও গন্তব্য আড়াল করতে তা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সটেক্স লিমিটেড, বেক্সিমকো ফ্যাশন লিমিটেডসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এসব অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগও আনা হয়েছে।
জামানত নিয়েও প্রশ্ন
দুদকের নথিতে আরও বলা হয়েছে, ৫৪৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে যে জামানতের কথা বলা হয়েছিল, সেটির যথাযথ যাচাই হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে ৬৫০ শতাংশ জমি জামানত হিসেবে প্রস্তাব করা হলেও ওই জমির মালিকানা ও বিস্তারিত তথ্য স্পষ্ট ছিল না। ডেফারেল মর্টগেজের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন করা হলেও পরবর্তী সময়ে জমির বন্ধক সম্পন্ন হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঋণের বিপরীতে তৃতীয় পক্ষের মালিকানাধীন বেক্সিমকো লিমিটেডের ১ কোটি ৩৫ লাখ শেয়ার লিয়েন রাখার বিষয়টিও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৬ সালের ২ আগস্টের বাজারমূল্য অনুযায়ী এসব শেয়ারের মূল্য ছিল ৩১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
ব্যাংকের পাওনা বেড়েছে ৬০৪ কোটি টাকা
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, অনুমোদিত ৫৪৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত আইএফআইসি ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৬ টাকা।
দুদকের অভিযোগ, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অস্তিত্ব, আর্থিক সক্ষমতা, জামানত এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যাচাই না করেই ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা, প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটি, ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগসাজশ, প্রতারণা, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুদকের বক্তব্য
দুদকের কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন, তিন দফায় মোট ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঋণের অর্থ বিতরণের পর এক দিনে সর্বোচ্চ ২৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্কাইমার্ক নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনুমোদিত ঋণের অর্থ পরে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এর সত্যতা যাচাই হবে।
এই ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

