পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তে দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নেওয়া ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে অন্তত আটটিতে প্রায় ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকার দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একই পরিবারের মালিকানাধীন আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেলেও এগুলোর মালিকানা একই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত।
এসব প্রকল্পে কাজের অগ্রগতির সঙ্গে অর্থ ছাড়ের সামঞ্জস্য না থাকার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ শুরু না হলেও ঠিকাদারকে চুক্তিমূল্যের বড় অংশ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর একটি উদাহরণ পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার শিকদার হাট–শ্রীপুর ডাক্তার হাট সড়ক। ১০ দশমিক ৬ কিলোমিটার এই সড়ক নির্মাণের জন্য তিন বছর আগে চুক্তি করা হলেও এখনো মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। অথচ ১৫ কোটি ৯২ লাখ টাকার কার্যাদেশের বিপরীতে ঠিকাদার ইতোমধ্যে পেয়েছেন ১৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা, যা চুক্তিমূল্যের ৮০ শতাংশের বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির অবস্থা খারাপ থাকায় সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এলজিইডির আগস্ট ২০২৬-এর একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি প্রকল্পে চুক্তিমূল্যের চেয়েও বেশি অর্থ পরিশোধের ঘটনা ঘটেছে। ৯৩৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের বিপরীতে ঠিকাদারকে ৯৯৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, আটটি প্রকল্পের সম্মিলিত চুক্তিমূল্য ছিল ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী যেখানে ৮২৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ছাড় হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বাস্তবে ছাড় করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ সম্পন্ন কাজের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা বেশি অর্থ ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে।
এই আটটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইএফটিই ডট ইটিসিএল (প্রাইভেট) লিমিটেড, ইএফটিই এন্টারপ্রাইজ, ইএফটিই ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, সাউথ বাংলা ট্রেডিং লিমিটেড, শিমু এন্টারপ্রাইজ, হরিণপালা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স তেলিখালী কনস্ট্রাকশন এবং ঈশান এন্টারপ্রাইজ।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটির মালিক সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন মহারাজ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, আগাম অর্থ ছাড়, একই কাজের জন্য একাধিকবার অর্থ প্রদান, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং নথি সংরক্ষণে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গবেষকরা সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার অভাবের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, প্রায় ২০০টি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই একমাত্র দরদাতা ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এলজিইডির তদন্ত প্রতিবেদনে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন মহারাজ, তাঁর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কয়েকজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মহিউদ্দীন মহারাজ দাবি করেছেন, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর ভাষ্য, যেসব সময়ের প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, তখন তিনি সংশ্লিষ্ট সরকারি দায়িত্বে ছিলেন না।
মিরাজুল ইসলামও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, অনেক প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বরাদ্দের অর্থ ফেরত যাওয়া ঠেকাতে আগাম অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি দাবি করেছেন, কাজ না করে কোনো অর্থ উত্তোলন করা হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে এসব অনিয়মের ঘটনায় ২৭ জনের বিরুদ্ধে আটটি মামলা করেছে। মামলায় মহিউদ্দীন মহারাজ, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং এলজিইডি ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, আংশিক কাজ সম্পন্ন হওয়া প্রকল্প থেকে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগে এসব মামলা করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্তদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
পিরোজপুরের এসব প্রকল্প এখন সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নও দীর্ঘদিন পিছিয়ে পড়ে। তাই প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: ডেইলি স্টার

