একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খেলনা কিংবা স্বপ্নের খাতা। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন চিত্র বলছে, দেশের কিছু শিশু অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর অপরাধে। শুধু ছোটখাটো অপরাধ নয়, তাদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা মামলার অভিযোগ।
পুলিশের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার হওয়া শিশুদের মধ্যে প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধে জড়ানো শিশুদের ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরছে। কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলায় গত সেপ্টেম্বরে ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে চলতি বছরের মে মাসে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে আট বছর বয়সী এক শিশুকে হত্যার ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। ২০১৯ সালে সুনামগঞ্জে পাঁচ বছর বয়সী তুহিন মিয়া হত্যা মামলায় তার ১৭ বছর বয়সী চাচাতো ভাইকে আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গবেষণার তথ্য বলছে, অনেক শিশু বন্ধু, স্থানীয় বড় ভাই কিংবা অপরাধী চক্রের প্রভাবে ধীরে ধীরে সহিংস অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন শিশুদের মানসিক বিকাশ, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা।
পুলিশ স্টাফ কলেজ দেশের আট বিভাগের ১৬০টি থানার মামলা বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা প্রকাশ করেছে। ‘সোশিওইকোনমিক ডিটারমিন্যান্টস অব চিলড্রেন ইন কনফ্লিক্ট উইথ দ্য ল: আ ক্রিমিনোলজিক্যাল অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে পুলিশ স্টাফ কলেজ জার্নালের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যায়।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন পুলিশ স্টাফ কলেজের গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও রামন চন্দ্র তালুকদার। গবেষণায় দেশের আট বিভাগের ১৬০টি পুলিশ স্টেশন থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি গাজীপুর বালক, গাজীপুর বালিকা ও যশোর বালক—এই তিনটি সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ৪০৪ শিশু এবং ১৫৬ অভিভাবকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, অপরাধে জড়ানো শিশুদের মধ্যে হত্যার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এরপর ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ধর্ষণে সহায়তা বা প্ররোচনার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশের বিরুদ্ধে চুরি, ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবহার, ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশের বিরুদ্ধে অপহরণ এবং ৯ দশমিক ৬১ শতাংশের বিরুদ্ধে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে বন্ধুমহলের প্রভাব গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। দেখা গেছে, অপরাধ সংঘটনের সময় ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ শিশু অন্য কারো সঙ্গে ছিল। তাদের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৯২ শতাংশের সঙ্গে থাকা ব্যক্তি ছিল বন্ধু।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব বন্ধুত্ব অনেক দিনের। গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধের সময় সঙ্গে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের গড় সময় ছিল আট বছর। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে অপরাধে যুক্ত হওয়ার পেছনে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর বয়সে বন্ধুমহলের স্বীকৃতি পাওয়ার প্রবণতা অনেক সময় শিশুদের ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। অপরাধী গোষ্ঠী বা কিশোর দলগুলো এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে শিশুদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে।
গবেষণায় শিশু অপরাধকে শুধু ব্যক্তিগত আচরণের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়নি। বরং পরিবার, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা ও সামাজিক পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৪৪ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশের পরিবারে আয় ছিল ব্যয়ের তুলনায় কম। এসব পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ১৯ হাজার ২৭৫ টাকা। তবে পরিবারের আয় ২ হাজার টাকা থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিল।
এছাড়া ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলা ছিল। এসব পরিবারের অভিযুক্ত সদস্যদের মধ্যে বাবার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের মধ্যে হত্যার অভিযোগের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব শিশু দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক অস্থিরতা বা সামাজিক অবহেলার মধ্যে বেড়ে ওঠে, তাদের অপরাধী চক্রের প্রভাবে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া সমাজের জন্য বড় সতর্কবার্তা। তার মতে, এদের পেছনের সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, কাউন্সেলিং, পারিবারিক তত্ত্বাবধান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনেক শিশু নিজের ইচ্ছায় অপরাধে জড়ায় না। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, মাদক, অপরাধী চক্রের প্রভাব এবং পরিবারের দুর্বল নজরদারি তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কেউ অপরাধে জড়ালে তাকে সাধারণ আসামির মতো বিবেচনা করা যায় না। তাদের বিচার হতে হবে বিশেষায়িত শিশু আদালতে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও শিশুদের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যায় না। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রেখে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
আইনের মূল লক্ষ্য হলো শাস্তি নয়, শিশুকে সমাজে ফিরিয়ে আনা।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রেও বয়স ও মানসিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের মতো কঠোর আচরণ করলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে অপরাধে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গবেষণায় শিশুদের দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিশু দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে কাটায়। তাদের বাইরে থাকার গড় সময় প্রায় ৮ ঘণ্টা।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাইরে থাকা, পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাওয়া, বন্ধুমহলের নেতিবাচক প্রভাব এবং পরিবারের নজরদারির অভাব শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
কিশোর অপরাধ মোকাবেলায় শুধু গ্রেফতার ও মামলা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শিশুদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হলে শিক্ষা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি, মানসিক সহায়তা, মাদক থেকে দূরে রাখা, কারিগরি শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা জরুরি।
কারণ একটি শিশু যখন অপরাধের পথে যায়, তখন শুধু একটি জীবন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ। তাই অপরাধের পর শাস্তির পাশাপাশি অপরাধে যাওয়ার পথগুলো বন্ধ করাই হতে হবে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

