দেশের তিন সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন আর্থিক ও প্রকল্প কার্যক্রম নিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকার নিরীক্ষা আপত্তি উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের, যা মোট আপত্তির অর্থমূল্যের প্রায় ৮৮ শতাংশ।
জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত মোট ৮০টি আপত্তির বিপরীতে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় ৩ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ৪৭ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা জড়িত।
তবে এসব অর্থকে এখনই নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ নিরীক্ষা আপত্তিগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও পরবর্তী যাচাইয়ের পর প্রকৃত দায় বা ক্ষতির বিষয়টি নির্ধারিত হবে।
১৩তম জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটির পঞ্চম বৈঠকে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
তিন বন্দর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মোট ৪ হাজার ৯৩৯টি নিরীক্ষা আপত্তি ছিল। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯৬৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এখনো ৯৭৪টি আপত্তি অমীমাংসিত রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের ৫৩৬টি, মোংলা বন্দরের ৩২৭টি এবং পায়রা বন্দরের ১১১টি আপত্তি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
পায়রা বন্দরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অঙ্কের আপত্তি এসেছে ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়ে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের প্রতিবেদনে থাকা পায়রা বন্দরের ২৬টি আপত্তির মধ্যে মাত্র দুটি ড্রেজিংসংক্রান্ত আপত্তির অর্থমূল্য প্রায় ৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। এটি বন্দরের সংশ্লিষ্ট আপত্তির মোট অর্থমূল্যের প্রায় ৯৪ শতাংশ।
একটি আপত্তিতে বলা হয়েছে, প্রকল্প প্রস্তাবে নির্ধারিত চ্যানেলের গভীরতা অর্জন না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারকে ২ হাজার ২৭ দশমিক ২০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
আরেকটি আপত্তিতে ১ হাজার ৫৮৩ দশমিক ১৬ কোটি টাকার ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিরীক্ষকদের মতে, সরকারি ক্রয়বিধি ও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে উপঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করানো হয়েছিল।
পায়রা বন্দরের অন্যান্য বড় আপত্তির মধ্যে রয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের জন্য প্রাপ্যের তুলনায় ১১৭ দশমিক ২৮ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ, খননকাজে ৫০ দশমিক ৩৭ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ এবং প্রয়োজনীয় ভাউচার উপস্থাপন না করায় ৪১ দশমিক ৯৬ কোটি টাকার ব্যয় যাচাই করতে না পারা।
একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল পরিশোধ, টাগবোটসংক্রান্ত অনিয়মিত ব্যয়, বার্থ ব্যবহারের পাওনা আদায় না করা এবং অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কথাও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ৩৫টি নিরীক্ষা আপত্তিতে প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আপত্তি প্রায় ১৬০ কোটি টাকার। নিরীক্ষার সময় এ অর্থসংক্রান্ত বিল ও ভাউচার উপস্থাপন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি বড় আপত্তি এসেছে শুল্ক কর্তৃপক্ষের নিলাম থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাপ্য অংশ আদায় না করার ঘটনায়। তিন অর্থবছরের এ-সংক্রান্ত আপত্তির মোট অর্থমূল্য প্রায় ১২১ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যান্য আপত্তির মধ্যে রয়েছে জমির ইজারা মূল্য আদায় না করা, বার্থ পরিচালনাকারীদের বিল থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত হারের চেয়ে কম আয়কর কাটা এবং টাগবোট সরবরাহ না হলেও ঠিকাদারকে অর্থ পরিশোধের অভিযোগ।
এ ছাড়া জাহাজ ডকিং ও মেরামতের কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না করেও অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে—এমন অভিযোগও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রয়েছে।
সংসদীয় কমিটি চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন কার্যক্রম ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা মেয়াদোত্তীর্ণ স্থায়ী আমানতের অর্থ ফেরত আনার বিষয়ও আলোচনা করেছে।
মোংলা বন্দরের ১৯টি নিরীক্ষা আপত্তিতে মোট ৪৭ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আপত্তি ২৯ দশমিক ৭১ কোটি টাকার, যা বন্দরের মালিকানাধীন ২৮ দশমিক ৮৪ একর জমি অন্যদের দখলে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ ছাড়া নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্যের বিপরীতে ৫ দশমিক ৪৫ কোটি টাকার বন্দর চার্জ আদায় না হওয়া, জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় কেনা দ্রুতগতির নৌযান চালু না করেও ৪ দশমিক ৮১ কোটি টাকা ব্যয় এবং জমি ও বাড়ি ভাড়া বাবদ ৩ দশমিক ১৫ কোটি টাকা আদায় না হওয়ার বিষয়ও নিরীক্ষা আপত্তিতে এসেছে।
সংসদীয় কমিটি মোংলা ও পায়রা বন্দরের ড্রেজিং কার্যক্রম এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করেছে। প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিটি বলেছে, কোনো অনিয়ম বা আর্থিক ক্ষতি প্রমাণিত হলে দায় নির্ধারণ করে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত নিরীক্ষা আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়ানো, সঠিক প্রকল্প পরিকল্পনা এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কর্মকর্তা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং তিন বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে তিন সমুদ্রবন্দরের নিরীক্ষা আপত্তিগুলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প তদারকির প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। বিশেষ করে পায়রা বন্দরের ড্রেজিং প্রকল্পে বড় অঙ্কের আপত্তি থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন, কাজের মান যাচাই এবং অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।

