দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক ও নগর এলাকায় ডাকাতি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতায় যাত্রী, চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও উত্তরাঞ্চলগামী বিভিন্ন মহাসড়ক এবং আঞ্চলিক সড়কে ডাকাতির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে যানজটে আটকে থাকা কিংবা ধীরগতিতে চলা যানবাহন থেকে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে সারা দেশে ডাকাতির ১২৩টি এবং ছিনতাইসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধের ৪৬৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ডাকাতির ঘটনা ছিল ২৮টি এবং ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ ১৫৩টি। আগস্টে ডাকাতি ৪২টি ও ছিনতাই ১৫৪টি এবং জুলাইয়ে ডাকাতি ৫৩টি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিল ১৬০টি।
তবে এসব পরিসংখ্যান মূলত মামলা ও পুলিশের নথিভুক্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অপরাধ বিশ্লেষকদের ধারণা, অনেক ঘটনা থানায় অভিযোগ বা মামলা পর্যন্ত না পৌঁছানোয় প্রকৃত চিত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। গত ১৪ অক্টোবর রাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাট এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে তিনজনকে আটক করে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি হাতকড়া ও দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে ডাকাতির পরিকল্পনা করছিল চক্রটি।
এর আগে ১০ অক্টোবর গভীর রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অস্ত্রের মুখে এক সাবেক সহকারী পুলিশ সুপারের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতেরা বাড়ির মালামাল ট্রাকে তুলে মহাসড়ক দিয়ে পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে। পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ওই চক্রের পাঁচ সদস্যকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে।
৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় গাজীপুরের শ্রীপুর-গোসিঙ্গা আঞ্চলিক সড়কে আরও একটি গুরুতর ঘটনার খবর পাওয়া যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ থেকে ১২টি মোটরসাইকেলে আসা সশস্ত্র একটি দল ব্যক্তিগত গাড়ির গতিরোধ করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এরপর গাড়িতে থাকা বিকাশের এক পরিবেশকের প্রায় তিন কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
৮ ও ৯ অক্টোবর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের কুমিরা ও ভাটিয়ারী এলাকায় চলন্ত গাড়ি লক্ষ্য করে লোহার পাইপ ও ভারী বস্তু ফেলে ছিনতাইয়ের একাধিক অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় যাত্রী ও প্রবাসীদের স্বর্ণালংকার এবং নগদ অর্থ লুটের কথা জানা গেছে। অন্যদিকে, ৪ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মোগড়াপাড়া এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ আন্তজেলা ডাকাত দলের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর আগে ৩০ আগস্ট রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন নির্জন গজারি বন এলাকায় চলন্ত গাড়িতে লোহার রড ছুড়ে ও সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
শুধু মহাসড়ক নয়, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরেও ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কদমতলী, শ্যামপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন এলাকায় পৃথক ঘটনায় ছুরিকাঘাতে তিনজন আহত হন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে ছিলেন আসিফ (২২), মানিক (৪৮) এবং ৩৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাত ব্যক্তি।
একই দিনে চট্টগ্রামের হালিশহরে অস্ত্রের মুখে এক সাংবাদিককে জিম্মি করে তাঁর বিকাশ হিসাব থেকে ৭০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া ৪ অক্টোবর মিরসরাইয়ে চলন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এক বৃদ্ধার স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর নরসিংদীতে চালককে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর পরদিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার সিগন্যালে এক যাত্রীর গাড়ির জানালা দিয়ে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অন্তত ১৫টি এলাকাকে ডাকাতিপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, কাঁচপুর সেতু, কেওঢালা, মোগড়াপাড়া ও ছোট সাদিপুর উল্লেখযোগ্য। মুন্সীগঞ্জের ভবেরচর, কুমিল্লার দাউদকান্দি, চান্দিনা, মাধাইয়া বাজার ও চৌদ্দগ্রামের কিছু নির্জন এলাকাতেও ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ফেনীর ফাজিলপুর এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া ও ভাটিয়ারী এলাকায় রাতে চলন্ত গাড়িতে ইট বা লোহার পাইপ ছুড়ে কিংবা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে ডাকাতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় প্রবাসী যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রাকও লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা থেকে রাজশাহী ও রংপুরগামী সড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গাজীপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন সড়কেও রাতের বেলায় ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মহাসড়কে সাধারণত দুই ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এক ধরনের চক্র নির্জন সড়ক ও অন্ধকার এলাকাকে বেছে নেয়। অন্য ধরনের চক্র নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। বিশেষ করে ঈদসহ বিভিন্ন সময়ে বিদেশ থেকে দেশে ফেরা প্রবাসীদের লক্ষ্য করে ডাকাতির ঘটনা ঘটতে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাইওয়ে পুলিশের একটি সহায়তা ডেস্ক রয়েছে। প্রবাসীরা চাইলে পুলিশের নিরাপত্তাসহায়তা চাইতে পারেন। কোনো যাত্রী নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানালে তাঁর যাত্রাপথে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, ঈদ ও শীতকালে ডাকাত চক্রের তৎপরতা বাড়তে পারে। শীতের সময় কুয়াশার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, বর্ষাকালে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা তুলনামূলক কম থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মহাসড়কে ডাকাতির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট পথে চলাচলকারী যাত্রী ও চালকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে পেশাদার ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও কঠোরতার ওপরও অপরাধের মাত্রা নির্ভর করতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, অনেক অপরাধী দিনের বেলায় বৈধ পেশায় যুক্ত থাকলেও রাতে ডাকাতি বা ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে। গুরুতর অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়ার পর কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়ায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রেপ্তার, জামিন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে পারে বলে মত দেন তিনি।
তবে হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন ও গণমাধ্যম) মুনতাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, পুলিশের কাছে থাকা সরকারি তথ্য অনুযায়ী মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা বাড়েনি। তাঁর ভাষ্য, গত মাস ও তার আগের মাসেও মহাসড়কে তিন থেকে চারটি ডাকাতির ঘটনার তথ্য ছিল। তারপরও কোথাও ডাকাতি বা অপরাধের প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক ও নগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমাতে পুলিশের তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় এবং অপরাধের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

