কুমিল্লায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই খুনের সংখ্যা গত পুরো বছরের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় খুন হয়েছেন ১১১ জন। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এ সংখ্যা ছিল ১০৩। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩৯টি, যেখানে গত বছর পুরো সময়ে ঘটেছিল ১৪৪টি। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। সর্বশেষ সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর হত্যাকাণ্ডে বিষয়টি আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
কুমিল্লার ১৮টি থানা থেকে সংগ্রহ করা তথ্য বলছে, নয় মাসে জেলায় নানা অপরাধে মামলা হয়েছে চার হাজার ৯৬৩টি। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২৩২টি, অপহরণ ১৪টি এবং ডাকাতি ৩৬টি। এর বাইরে দাঙ্গা, দস্যুতা, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের মামলাও রয়েছে।
মাসওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ১৪টি খুন, ১৬টি ধর্ষণ ও ১৭টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ মোট ৪৯১টি অপরাধের মামলা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ১২টি খুন, আটটি ধর্ষণ ও ১৯টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ মামলা ছিল ৪০৭টি। মার্চে ১১টি খুন, নয়টি ধর্ষণ ও ১৮টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ মোট ৫১৭টি মামলা হয়। এপ্রিলে ১০টি খুন, ২০টি ধর্ষণ ও ২৮টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ অপরাধের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮৪টিতে।
মে মাসে খুনের ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি, ১৭টি। ওই মাসে ১২টি ধর্ষণ ও ২৪টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ মোট অপরাধ ছিল ৬১২টি। জুনে খুন হয় ১০টি, ধর্ষণ ২১টি। তবে এ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল সর্বোচ্চ ৪১টি, মোট অপরাধ ৫৭৭টি। জুলাইয়ে ১০টি খুন, ২২টি ধর্ষণ ও ৩০টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ অপরাধ ঘটেছে ৫০৯টি। আগস্টে ১১টি খুন, ১৭টি ধর্ষণ ও ২১টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৫৮৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ১৬টি খুন, ১৪টি ধর্ষণ ও ৩৪টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ অপরাধের সংখ্যা উঠেছে ৬৮১টিতে, যা নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই হিসাব থেকে একটি স্পষ্ট প্রবণতা চোখে পড়ে। বছরের প্রথম দুই মাসের তুলনায় পরের মাসগুলোতে অপরাধের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে মামলা ছিল ৪০৭টি, আর সেপ্টেম্বরে তা প্রায় ৬৮১টিতে পৌঁছেছে। খুনের সংখ্যাও মাসে ১০ থেকে ১৭-এর মধ্যে ওঠানামা করেছে, অর্থাৎ কোনো মাসই তুলনামূলক শান্ত যায়নি। গড় হিসাবে প্রতিমাসে জেলায় ১২টির বেশি খুন হয়েছে।
এই সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা সারা দেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে কুমিল্লায় এসে মহাসড়কের ঝাগুরঝুলি এলাকায় নামার পর কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সোহাগ, এমরান, রাহাত ও সুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
আগস্টে দেবিদ্বার উপজেলা সদরে আরেকটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। ৭ আগস্ট রাতে ফরিদা ইয়াসমিন নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তাঁর লাশ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। পরদিন পাশের একটি ডোবা থেকে পলিথিনে মোড়ানো লাশের খণ্ডগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তার ও তাঁর সহযোগী আমির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বেরিয়ে সে নিখোঁজ হয়। পরদিন লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ এ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের ভাষ্য, আইফোনের জন্য তারা অপ্রতিমকে হত্যা করে। একটি মোবাইল ফোনের জন্য কিশোরদের হাতে আরেক কিশোরের প্রাণ যাওয়ার ঘটনা কিশোর অপরাধের ভয়াবহ রূপই সামনে এনেছে।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে অক্টোবরের শুরুতে। গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে বের হয় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী। ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমন মিয়া ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
অপরাধের এই চিত্র নিয়ে পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ভিন্ন। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান সমকালকে বলেছেন, হত্যা ও ধর্ষণসহ প্রতিটি ঘটনার রহস্য পুলিশ কম সময়ে উন্মোচন করতে পেরেছে। তাঁর ভাষ্য, জেলার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, এসআরবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ করছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী টানা অভিযানে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। তাঁর মতে, নানামুখী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
তবে ঘটনার রহস্য উন্মোচন আর অপরাধ প্রতিরোধ এক বিষয় নয়। অপরাধ ঘটার পর অপরাধীকে ধরা পুলিশের সাফল্য হলেও অপরাধের সংখ্যা যে বাড়ছে, তা পুলিশের নিজস্ব তথ্যেই স্পষ্ট। অর্থাৎ গ্রেপ্তারের সাফল্য সত্ত্বেও অপরাধ ঠেকানো যাচ্ছে না, এই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, কিশোর অপরাধসহ সমাজে নানামুখী অপরাধ বেড়েছে। তাঁর মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং সুন্দর সমাজ গড়তে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, গতানুগতিক পদ্ধতিতে আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। তাঁর মতে, কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। শিশু-কিশোররা যেন মোবাইল ফোনে আসক্ত না হয়, সে জন্য অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে।
ধর্ষণের মামলা নিয়ে আদালত ও চিকিৎসাব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতার কথাও উঠে এসেছে। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ বদিউল আলম সুজন সমকালকে জানান, তদন্তে ধীরগতি, একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল, ডাক্তারি পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে দেরি এবং সাক্ষী না পাওয়ার কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট সময়মতো সাক্ষী না পাওয়ায়ও জট তৈরি হয়। এতে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, অনেক সময় আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীকে পরীক্ষার জন্য আনা হয়। পোশাকসহ অন্যান্য আলামতও সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে ডিএনএ নমুনার পরীক্ষায় অনেক সময় ফল পাওয়া যায় না।
এই দুই বক্তব্য একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, ধর্ষণের ঘটনায় বিচার পাওয়ার পথ শুধু আদালতে আটকে নেই। শুরুতেই আলামত সংরক্ষণে ঘাটতি থাকলে পরবর্তী ধাপে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। তদন্ত কর্মকর্তা বারবার বদল হলে মামলার গতি কমে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতার কারণে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, আর ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের আস্থা কমে যায়।
নয় মাসের তথ্যে আরেকটি বিষয় নজর কাড়ে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রায় প্রতিমাসেই ২০-এর ওপরে থেকেছে, আর জুনে তা ৪১-এ পৌঁছেছে। এর সঙ্গে ধর্ষণের ১৩৯টি ঘটনা যোগ করলে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট হয়। সম্প্রতি আলোচিত দুটি ঘটনায় ভুক্তভোগী দুজনই সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী, যা স্কুলগামী শিশুদের নিরাপত্তা ও অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে।
গত বছরের তুলনায় নয় মাসে খুন বেশি হওয়ায় বছরের বাকি তিন মাসে সংখ্যাটি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধর্ষণের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই দিকে এগোচ্ছে। গত বছরের ১৪৪টির তুলনায় এ বছর নয় মাসেই ১৩৯টি ঘটনা ঘটেছে, ফলে বছর শেষে তা গত বছরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
সব মিলিয়ে কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় সামনে আসছে। প্রথমত, অপরাধের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে এবং কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত, পুলিশের দ্রুত রহস্য উন্মোচনের সাফল্য থাকলেও ফরেনসিক, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা শাস্তি নিশ্চিত করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখন নজর থাকবে, অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন মিলে কিশোর অপরাধ ও নারী-শিশুদের প্রতি সহিংসতা ঠেকাতে কী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।

