মাছের পোনা কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অথচ সেই পোনা বাঁওড়ে অবমুক্ত করা ও প্রকল্পের অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ পোনা কেনার তুলনায় অন্যান্য খাতে প্রায় ১৫ গুণ বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠেছে।
যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ২৯টি বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগটি ভালো। তবে এসি ও কম্পিউটার কেনাসহ কয়েকটি খাতে প্রস্তাবিত ব্যয় অস্বাভাবিক। এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পোনা কেনার বাইরে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং এসব খাত মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
বাঁওড় হলো নদীর পরিত্যক্ত বাঁক থেকে সৃষ্ট জলাশয়। এসব জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পোনা অবমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও প্রকল্পের মোট ব্যয়ের তুলনায় পোনা কেনার বরাদ্দ খুবই কম।
প্রকল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, মোট ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার মধ্যে পোনা কেনার জন্য বরাদ্দ ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বাকি ৪৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে অন্যান্য খাতে। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ পোনা কেনার জন্য রাখা হয়েছে। বাকি ৯৩ দশমিক ৯০ শতাংশ ব্যয় হবে অন্যান্য কাজে।
প্রকল্পের আওতায় ২৯টি বাঁওড়ে রুই ও দেশি ছোট প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে মাছের উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে এসব বাঁওড়ে বছরে কত মাছ উৎপাদিত হয়, উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়লে অতিরিক্ত কত মাছ পাওয়া যাবে এবং এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ভিত্তি কী, তা প্রকল্প প্রস্তাবে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি।
এ ছাড়া কত পোনা কেনা হবে, প্রজাতিভেদে পোনার সংখ্যা ও দাম কত হবে এবং অবমুক্ত করা পোনার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার বিষয়টি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, সে সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাবে চারটি কম্পিউটার কেনার জন্য আট লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিটি কম্পিউটারের গড় দাম দুই লাখ টাকা। এ ছাড়া এসি ও ফটোকপি মেশিন কেনা, অফিস ভাড়া এবং সভা-সেমিনার আয়োজনের ব্যয়ও রয়েছে।
তবে কম্পিউটারের কনফিগারেশন, যন্ত্রাংশ ও কেনাকাটার শর্ত উল্লেখ না থাকায় এর প্রস্তাবিত দাম বাজারদরের তুলনায় বেশি কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে এসব সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য ব্যবহারকারী এবং ব্যবহারের পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে।
একইভাবে অফিস ভাড়া ও সভা-সেমিনারের জন্য মোট কত টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং এসব ব্যয়ের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের সম্পর্ক কী, তা মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকে জানতে চাওয়া হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ছয়টি পদে জনবল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি পদে প্রেষণে, একটি পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে এবং দুটি পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এসব পদের দায়িত্ব, জনবল বাবদ মোট ব্যয় এবং তাঁদের কাজের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কী ধরনের ফল পাওয়া যাবে, তা প্রকল্পের ব্যয় মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে বেতন-ভাতা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। অর্থাৎ এখনো এর জন্য এডিপিতে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়নি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১ অক্টোবরের চিঠি অনুযায়ী, প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ৬ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে প্রকল্পটি নিয়ে যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২২ এপ্রিল অর্থ বিভাগে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় প্রকল্পের জনবল নির্ধারণ নিয়ে সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশ ডিপিপিতে যুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক বলেন, তিনি এখনো ডিপিপি দেখেননি। প্রস্তাবটি না দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে প্রকল্পটির প্রণেতা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাহেদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
তবে সাহেদ আলীর মুঠোফোনে কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পটির লক্ষ্য বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানো হলেও প্রস্তাবিত ব্যয়ের বড় অংশ অন্যান্য খাতে রাখার যৌক্তিকতা, উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ভিত্তি এবং মাঠপর্যায়ে ব্যয়ের সম্ভাব্য প্রভাব স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে বিস্তারিত মূল্যায়নের পরই প্রকল্পের ব্যয় ও কার্যক্রমের কার্যকারিতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
সূত্র: যুগান্তর

