রপ্তানিমুখী বস্ত্র ও তোয়ালে উৎপাদন ব্যবসার আড়ালে জাল রপ্তানি নথি, অনিয়মিত ঋণপত্র এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি শুধু ঋণ জালিয়াতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং আর্থিক তদারকির দুর্বলতাও সামনে নিয়ে আসে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত অনুযায়ী, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের বিভিন্ন অর্থায়ন সুবিধা ব্যবহার করে মোট ১ হাজার ১৭৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯০ কোটি ৩ লাখ টাকা ছিল সরাসরি অর্থায়নসংক্রান্ত দায় এবং ১৮৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ছিল পরোক্ষ অর্থায়নসংক্রান্ত দায়।
এই ঘটনায় জড়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক এবং বেসরকারি প্রাইম ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক।
যেভাবে সামনে আসে ঋণ জালিয়াতি
২০১৩ সালে বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিরুদ্ধে পাঁচটি ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, জাল রপ্তানি চুক্তি ও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি ১৩২টি ঋণপত্রের বিপরীতে রপ্তানি করা পণ্যের অর্থ দেশে ফেরত আনা হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের ২০১৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও রপ্তানি বিল, পশ্চাৎমুখী ঋণপত্র এবং জোরপূর্বক ঋণ সৃষ্টির মতো বিভিন্ন অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়।
তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগও উঠে আসে। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই কীভাবে এত বড় অঙ্কের অর্থায়ন অনুমোদিত হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
৫৪ জনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা
২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫৪ জনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
অভিযুক্তদের মধ্যে গ্রুপটির শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারাও ছিলেন। ঢাকার রমনা, মতিঝিল ও নিউমার্কেট থানায় মামলাগুলো করা হয়।
পরবর্তী সময়ে তদন্ত শেষে বিভিন্ন মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। এসব মামলায় আর্থিক অনিয়ম, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়।
তবে প্রতিটি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ও অর্থের পরিমাণ এক ছিল না। তাই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়াকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০১৮ ও ২০২৫ সালে দুটি বড় সাজা
বিসমিল্লাহ গ্রুপের অর্থ পাচারের ঘটনায় আদালত অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন।
২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি বিশেষ আদালত অর্থ পাচারের মামলায় গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী ও চেয়ারম্যান নওরীন হাবিবসহ নয়জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাঁদের প্রায় ৩০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়।
ওই সময় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পলাতক ছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।
এরপর ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ আরেকটি অর্থ পাচার মামলায় আটজনকে ১২ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী নওরীন হাবিব, বাবা শফিকুল আনোয়ার চৌধুরী, বিসমিল্লাহ গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আকবর আজিজ মুত্তাকি, মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবুল হাসান চৌধুরী, ব্যবস্থাপক রিয়াজ উদ্দিন শফি, নেটওয়ার্ক ফ্রেম সিস্টেম লিমিটেডের চেয়ারম্যান আখতার হোসেন এবং যমুনা ব্যাংকের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হোসেন।
মামলাটিতে প্রায় ১২৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা অর্থ পাচারের অভিযোগ ছিল। আদালত আসামিদের মোট ২৪৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন। একই সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া দণ্ডপ্রাপ্তদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়।
তবে একই মামলায় অভিযুক্ত যমুনা ব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোর্শেদুর রহমান ও এস এম জাহিদুল ইসলাম অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান।
আদালতের সাজা, কিন্তু এখনো পলাতক আসামিরা
বিসমিল্লাহ গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের রায় কার্যকরের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানসহ সাত পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নিতেও বলা হয়েছিল।
এ বিষয়ে পুলিশপ্রধান এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালককে অগ্রগতি জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্থ পাচার মামলার রায়ের পর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও আট দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল এবং গ্রেপ্তার অথবা আত্মসমর্পণের পর সাজা কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়।
তবে ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান দণ্ডপ্রাপ্তদের গ্রেপ্তার কিংবা সর্বশেষ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে নতুন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি।
অর্থাৎ আদালত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দিয়েছেন—এটি থেকে আদেশগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ব্যাংকের টাকা উদ্ধারের হিসাব এখনো অস্পষ্ট
মামলায় সাজা হলেও ব্যাংকের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। কারণ অপরাধের জন্য কারাদণ্ড এবং আত্মসাৎ করা অর্থ বা সম্পদ উদ্ধার দুটি পৃথক আইনি প্রক্রিয়া।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিসমিল্লাহ গ্রুপের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা বেড়ে ৫৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের অনুমোদনও দিয়েছিল ব্যাংকটি।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, যমুনা ব্যাংক বন্ধক রাখা সম্পত্তি বিক্রি করে ৭ কোটি টাকা আদায় করেছিল এবং গ্রুপটির বিরুদ্ধে অর্থ উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল।
তবে এগুলো ২০২০ সালের পরিস্থিতির তথ্য। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট পাওনা কত, কত টাকা আদায় হয়েছে এবং কত টাকা এখনো অনাদায়ী রয়েছে, তার হালনাগাদ ও যাচাইকৃত হিসাব পাওয়া যায়নি।
প্রকৃত অবস্থা জানতে প্রতিটি ব্যাংকের ঋণের মূল অর্থ, সুদ, আদায় করা অর্থ, বিক্রি করা সম্পত্তি এবং চলমান অর্থঋণ মামলার তথ্য আলাদাভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অর্থ উদ্ধার ও আইনি জবাবদিহির বাকি ধাপ
বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঘটনায় অপরাধের বিচার, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংকের পাওনা আদায়—তিনটি বিষয় আলাদাভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রথমত, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের সাজা কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজেয়াপ্তের আদেশ অনুযায়ী তাঁদের সম্পত্তি শনাক্ত করে আইনগত প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রহীতা ও জামিনদারদের কাছ থেকে আইন অনুযায়ী পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও ব্যক্তিভিত্তিক প্রমাণ ও আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা জরুরি। একইভাবে দেশের বাইরে থাকা অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।
ব্যাংক তদারকিতে কী শিক্ষা দিল এই কেলেঙ্কারি
বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাতে রপ্তানি বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থায়নের ঝুঁকি এবং নথি যাচাইয়ের দুর্বলতা সামনে এনেছে।
ঋণপত্র ও রপ্তানি বিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক অর্থায়নব্যবস্থা। কিন্তু ভুয়া কাগজপত্র বা অস্তিত্বহীন বাণিজ্যিক লেনদেনের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হলে ব্যাংক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে রপ্তানি চুক্তি, পণ্য পরিবহনের নথি, শুল্কসংক্রান্ত তথ্য, বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন এবং রপ্তানি আয় দেশে ফেরার বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাজা নয়, অর্থ ফেরত পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ
বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি এক যুগেরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশের আর্থিক খাতে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে রয়েছে।
২০১৮ ও ২০২৫ সালের আদালতের রায় অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু এর পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্তদের গ্রেপ্তার, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকের পাওনা উদ্ধারের প্রকৃত অগ্রগতিও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কারণ ব্যাংকের অর্থ মূলত আমানতকারীদের জমা রাখা অর্থ। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে অনাদায়ী ঋণের আর্থিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর অর্থনীতি ও জনগণের ওপরও পড়তে পারে।
এই কেলেঙ্কারির চূড়ান্ত জবাবদিহি শুধু কারাদণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আত্মসাৎ করা অর্থের কতটা উদ্ধার হলো, আদালতের নির্দেশ কতটা কার্যকর হলো এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের জালিয়াতি ঠেকাতে ব্যাংকিং তদারকিতে কী পরিবর্তন আনা হলো—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তরই হবে প্রকৃত অগ্রগতির মাপকাঠি।
সূত্র: Obserberbd

