রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি কোম্পানিগুলো বর্তমানে এক গভীর নগদ সংকটের সম্মুখীন। প্রায় ২৭০০ কোটি টাকার বকেয়া কর পরিশোধের অর্থ ফেরত না পাওয়ার কারণে, এ খাতের প্রতিষ্ঠানের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই ঘাটতির কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হতে পারে। যা দেশের সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে।
পেট্রোবাংলা জানায়, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে প্রায় ২০৮৯ কোটি টাকা ফেরতযোগ্য রয়েছে। এর পাশাপাশি, অন্যান্য চারটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বকেয়া প্রায় ৫৫৭ কোটি টাকা।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কাছে ১৯৭ কোটি টাকা, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমসের কাছে ২১৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কাছে ৯৮ দশমিক ৯ কোটি টাকা এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের কাছে ৪৫ দশমিক ৮ কোটি টাকা প্রদান করতে হবে।
পেট্রোবাংলার অর্থ পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, এই সাশ্রয়ী কর্মসূচি প্রাথমিকভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে কর পরিশোধের স্থিতি ছিল ফেরতযোগ্য। তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার করের হার ৩ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু নতুন বিধিমালায় সেই কর ফেরতের সুযোগ বাদ দেওয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলা এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে করের সমন্বয়যোগ্যতা বা ফেরতযোগ্যতা পুনর্বহাল করার দাবি জানিয়েছে। পেট্রোবাংলার যুগ্ম সচিব এ.জেড.এম শরজিল হাসান ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর তারিখে এক চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, গ্যাস কোম্পানিগুলোর তরলতা সংকট গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে আবাসিক ব্যবহারকারীদের বাদ দিয়ে গ্যাসের আটটি শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য ২ শতাংশ উৎস কর আদায় করা হয়, যা বিতরণকারী সংস্থাগুলো সংগ্রহ করে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস কোম্পানিগুলো সরবরাহ করা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের জন্য ০ দশমিক ৮৬ টাকা করে পরিশোধ করে। যেখানে তাদের মুনাফার সীমা ০ দশমিক ১৮ টাকা থেকে ০ দশমিক ৩৭ টাকার মধ্যে। এই মুনাফার পরিমাণ ২২ দশমিক ৮৭ টাকা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্যের ভিত্তিতে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্যাস কোম্পানিগুলোর মোট বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল ৫৮৪ দশমিক ৮২ বিলিয়ন টাকা। যেখানে গ্যাস বিক্রির (অভ্যন্তরীণ গ্রাহকদের বাদে) পরিমাণ ছিল ৫২৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন টাকা। এর বিপরীতে, পরিশোধযোগ্য কর ছিল ১৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন টাকা। যেখানে মুনাফার পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য, গ্যাস কোম্পানিগুলো মোট গ্যাস বিক্রির মূল্য ৫৮৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন টাকা ধরে ২ শতাংশ কর হারে ১১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন টাকা পরিশোধযোগ্য কর এবং ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন টাকা মুনাফার প্রত্যাশা করছে।
এ বিষয়ে এক জ্যৈষ্ঠ কর কর্মকর্তা জানান, ফিল্ড অফিসগুলো সাধারণত কর ফেরতের অনুমোদনে অনিচ্ছুক থাকে। কারণ তারা উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপের মধ্যে থাকে। যদিও এনবিআর পেট্রোবাংলার সঙ্গে বকেয়া করের জটিলতা নিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো সফলতা মেলেনি।
এ পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক সংকট দেখা দিতে পারে। যা দেশের জ্বালানি খাতের সংকট আরো তীব্র করে তুলবে।

