কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশের প্রায় ১২ শতাংশ জিডিপি এবং ৭ শতাংশ রপ্তানি আয় সরাসরি কৃষি থেকে আসে। তিন কোটিরও বেশি মানুষ কৃষি পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবুও এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ঘুষের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ। সরকার প্রতি বছর কৃষকদের ফসল উৎপাদনে উৎসাহ দিতে স্বল্প সুদে এবং সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ করলেও এই ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দুর্নীতির কারণে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ৩৭ হাজার ১৫৩ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করে। তবে কৃষকরা এই ঋণ পেতে গড়ে ৬.৮২ শতাংশ হারে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এটি শুধুমাত্র একটি অর্থবছরের চিত্র নয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও ১৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণে একই হারে ঘুষ লেনদেন হয়েছিল। কৃষকদের দেওয়া এই ঘুষের পরিমাণ ছিল প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।
ঘুষের পাশাপাশি আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, বিতরণ করা কৃষিঋণের অর্ধেকেরও কম প্রকৃত কৃষি খাতে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ, মাত্র ৫৪ শতাংশ ঋণ কৃষি উৎপাদনে ব্যবহার হলেও বাকি অর্থ অন্য খাতে চলে যাচ্ছে।
শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- সরকারি ডিলারদের দুর্নীতির কারণে সারের প্রাপ্যতা হ্রাস এবং প্রান্তিক উৎপাদনশীলতার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমন মৌসুমে সারের ঘাটতি কৃষকদের উৎপাদনশীলতা ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। প্রান্তিক কৃষকেরা বড় কৃষকদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার এ পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন- “যদি কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তবে এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। যারা গরিব কৃষকদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে বিষয়গুলো আমাদের পর্যায় পর্যন্ত সাধারণত আসে না।”
সরকার যদিও প্রতি বছর কৃষিঋণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে, তবে এ খাতে দুর্নীতির ফলে এর সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮ হাজার কোটি টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এই লক্ষ্যমাত্রার পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষি পেশায় নিয়োজিত। তবে কৃষি খাত দেশের মোট বাজেটে সবচেয়ে কম বরাদ্দ পায়। এছাড়া দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে প্রান্তিক কৃষকেরা উন্নয়নের স্রোত থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে- কৃষিখাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি করে উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশেষ ফসলের ক্ষেত্রে এই হার আরও কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়। এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে ৫০ শতাংশ এসএমই ঋণ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন- কৃষিঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। দুর্নীতিবাজ ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া, কৃষকদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে।
কৃষি খাত দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। কিন্তু এই খাতের উপর ঘুষ, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কৃষিঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া সংস্কার করে এই সমস্যার সমাধান করা। নীতি প্রণয়ন থেকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন পর্যন্ত স্বচ্ছতা এবং সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করা গেলে, কৃষি খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

