বাংলাদেশের ২৯টি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (IIG) সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এখনও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে প্রায় ২০৫ কোটি টাকা বকেয়া রেখেছে। নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোপুরি বকেয়া পরিশোধ করেনি।
বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর ৩০টি আইআইজি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২২০ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিল। নির্ধারিত সময় ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি পার হলেও শুধুমাত্র ১৫টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে লেভেল-৩ ক্যারিয়ার লিমিটেড সর্বোচ্চ ১০.৮১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। আর কোরোনেট কর্পোরেশন লিমিটেড মাত্র ৩ লাখ টাকা বকেয়া পরিশোধ করে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত হয়েছে।
বড় পাঁচটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট বকেয়ার ৭৭ শতাংশেরও বেশি রয়েছে। তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। যার ৫১.৫৮ কোটি টাকা বকেয়া। অন্যান্য ঋণখেলাপির মধ্যে রয়েছে—
- আমরা টেকনোলজিস: ২৫.৪৮ কোটি টাকা
- আর্থ টেলিকম: ৩২.০২ কোটি টাকা
- লেভেল-৩ ক্যারিয়ার লিমিটেড: ১১.২১ কোটি টাকা
- পিয়েরেক্স নেটওয়ার্কস: ১৫.৯৯ কোটি টাকা
- উইন্ডস্ট্রিম কমিউনিকেশন: ১১.৪৮ কোটি টাকা
- ডেল্টা ইনফোকম: ১০.৫৯ কোটি টাকা
বিটিসিএল এখনো কোনো পরিশোধ করেনি এবং সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে নোভোকম, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল, রেগো কমিউনিকেশনস, ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স কমিউনিকেশন ও প্ল্যানেট ইন্টারনেট গেটওয়ে এখনও কোনো উত্তর দেয়নি।
বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের জন্য আবেদন করেছে। আমরা টেকনোলজিস ১ কোটি টাকা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৩৬ কিস্তিতে বাকি অর্থ পরিশোধের অনুমতি চেয়েছে। তবে বিটিআরসি জানিয়েছে, ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স নবায়নের সময়সীমা শেষ হবে, ফলে ৩৬ মাসের কিস্তির প্রস্তাব অযৌক্তিক। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ স্থগিত রয়েছে।
এছাড়া, বিডিহাব লিমিটেড ৪৯ লাখ টাকা ছয় মাসের কিস্তিতে পরিশোধের অনুরোধ করেছে এবং ৬৬ লাখ টাকা দেরি ফি মওকুফের আবেদন করেছে। ম্যাঙ্গো টেলিসার্ভিস লিমিটেড ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বকেয়া পরিশোধের জন্য ১৫ দিনের সময় চেয়েছে। ভার্গো কমিউনিকেশন লিমিটেড ১০ লাখ টাকা ফেব্রুয়ারির মধ্যে পরিশোধ করতে চায়। বাকি অর্থ ১৫ কিস্তিতে শোধের আবেদন করেছে।
গ্লোবাল ফেয়ার কমিউনিকেশন লিমিটেড ৩০ কিস্তিতে সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধের অনুমতি চেয়েছে। ইন্ট্রাগ্লোব কমিউনিকেশন লিমিটেড এক মাসের মধ্যে পরিশোধের কথা বলেছে। আর ম্যাক্সনেট অনলাইন তিন কিস্তিতে টাকা শোধের আবেদন করেছে। ভেলোসিটি নেটওয়ার্ক পর্যায়ক্রমে পরিশোধের অনুমতি চেয়েছে।
বর্তমানে অঘোষিত ব্যান্ডউইডথ চার্জ বাবদ ৯০.৫২ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। ডেল্টা, ম্যাক্সহাব, স্টারট্রেক, এক্সাবাইট, সাইবারগেট ও এডিএন টেলিকম তাদের হিসাব সংশোধনের জন্য আবেদন করেছে। কারণ তাদের মতে বিটিআরসির নির্দেশিকায় এই চার্জের উল্লেখ নেই এবং এটি হিসাবের ভুলও হতে পারে।
পিয়েরেক্স নেটওয়ার্কস লিমিটেড উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে বিটিআরসির নির্দেশনার ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ পেয়েছে। ফাইবার হোম গ্লোবাল লিমিটেড, যার ভ্যাট সংক্রান্ত বকেয়া ৫.৯০ কোটি টাকা। তারা জানিয়েছে, তাদের ভ্যাট সংক্রান্ত মামলা আদালতে বিচারাধীন এবং আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট বাদ দিয়ে রাজস্ব ভাগের অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিটিআরসি বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং যারা এখনো নিয়মিত বকেয়া পরিশোধ করেনি। তাদের ১০ দিনের চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠাবে।
বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, আইআইজিগুলোর ক্রয় করা ব্যান্ডউইডথের একটি অংশ অবিক্রিত থাকে। আরেকটি অংশ ট্রাফিক প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে বরাদ্দ করা হয়। তবে বিটিআরসির অঘোষিত ব্যান্ডউইডথ সংক্রান্ত হিসাব এ বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি।
তিনি আরও বলেন, বিটিআরসি নির্দিষ্ট বিক্রয় মূল্যের ভিত্তিতে রাজস্ব ভাগ নির্ধারণ করে। যা বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এই পদ্ধতির পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

