দেশের বিভিন্ন জেলায় মহাসড়ক উন্নয়নের নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ঝিনাইদহ জেলার গ্রামীণ সড়কগুলো এখনো অবহেলিত। জেলার মোট গ্রামীণ সড়কের প্রায় ৪৭ শতাংশই কাঁচা রয়ে গেছে। যা স্থানীয় জনজীবনকে প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত করে তুলেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহ জেলার ছয় উপজেলায় গ্রামীণ সড়কের মোট পরিমাণ ৫ হাজার ৬৪৬ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৬৮ দশমিক ১০ কিলোমিটার সড়ক এখনো কাঁচা। আর পাকা সড়কের পরিমাণ ২ হাজার ৯৭৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষাকালে কাঁদা-পানি আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সদর উপজেলা, হরিণাকুণ্ডু, শৈলকুপা ও মহেশপুরের বিভিন্ন এলাকায় গেলে সড়কের এই ভোগান্তির চিত্র স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এসব এলাকায় মানুষের যাত্রাপথ এখনো কাদা ও ধুলার ওপর নির্ভরশীল। পথচারীদের রোদ, বৃষ্টি, ধুলাবালি মাথায় নিয়েই চলাচল করতে হয়।
এলজিইডির তথ্য অনুসারে, সদর উপজেলায় গ্রামীণ সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ৫১৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৭৫৭ কিলোমিটার সড়ক কাঁচা এবং ৭৫৯ দশমিক ৫০ কিলোমিটার সড়ক পাকা। হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় ৫১৩ দশমিক ৬০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা হয়েছে ৩৫৫ কিলোমিটার। আর কাঁচা সড়ক রয়েছে ১৬৮ দশমিক ৬০ কিলোমিটার। শৈলকুপা উপজেলায় গ্রামীণ সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ১১৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার। যার মধ্যে কাঁচা সড়ক ৪৭৪ দশমিক ৩০ কিলোমিটার এবং পাকা সড়ক ৬৪৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার।
সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘কাঁচা সড়কের কারণে স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসীকে প্রতিদিন অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সরকারি প্রতিনিধিরা এলাকায় আসেন কিন্তু সড়কের অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না।’
কালীগঞ্জ উপজেলায় গ্রামীণ সড়কের পরিমাণ ৮৯০ দশমিক ৯০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা সড়ক ৩৮১ দশমিক ২০ কিলোমিটার এবং পাকা সড়ক ৫০১ দশমিক ৭০ কিলোমিটার। কোটচাঁদপুর উপজেলায় ৪৪২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ১৯৪ কিলোমিটার এবং পাকা সড়ক ২৪৮ দশমিক ৯০ কিলোমিটার।
কোটচাঁদপুর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘লক্ষ্মীপুর মোড় থেকে ভোমরাডাঙ্গা গ্রাম পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার রাস্তা। সামান্য বৃষ্টি হলেই এই রাস্তা পাড়ি দিতে আমাদের ১০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। আমার দাদা ও বাবাও এমনই দেখে গেছেন। এখন আমাদের জীবনও প্রায় শেষের দিকে। জানি না, আমরা জীবিত থাকতে এই রাস্তাটি পাকা হবে কিনা।’
মহেশপুর উপজেলায় গ্রামীণ সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ১৫৩ দশমিক ৩০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ৬৬২ কিলোমিটার এবং পাকা সড়ক ৪৯১ দশমিক ৩০ কিলোমিটার। মহেশপুরের ইজিবাইক চালক রফিক হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই কাঁচা সড়কগুলোয় চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পথচারীদের পাশাপাশি আমাদের মতো ইজিবাইক চালকরাও ভোগান্তিতে পড়ি।’
ঝিনাইদহ জেলার কাঁচা সড়কগুলো পাকাকরণের বিষয়ে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মনোয়ার উদ্দিন জানান, জেলার কাঁচা সড়কগুলো পাকাকরণের জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫০০ কিলোমিটার সড়ক পাকা করা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে ২০০ কিলোমিটার সড়কের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং আরো ৩০০ কিলোমিটার সড়কের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি আরো বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাঁচা সড়কগুলো পাকা করার কাজ এগিয়ে নেয়া হবে।
ঝিনাইদহ জেলার গ্রামীণ সড়কগুলোর এই করুণ অবস্থা স্থানীয় জনজীবনকে দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত এই এলাকার মানুষদের আশা, খুব শীঘ্রই তাদের সড়কগুলো পাকা হয়ে যাত্রাপথ সুগম হবে এবং তাদের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে।

