র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন–এর সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ অভিযোগ তুলে ধরেছেন তাঁর একসময়ের দেহরক্ষী ও সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। তিনি দাবি করেছেন, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ জনকে বিভিন্নভাবে হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন।
গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম-খুনের অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় তিনি ছিলেন প্রসিকিউশনের পঞ্চম সাক্ষী।
জবানবন্দি দেওয়ার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী।
ইমরুল কায়েস তাঁর জবানবন্দিতে জানান, তিনি ২০০১ সালের ৫ এপ্রিল সেনাবাহিনীর আর্মার্ড কোরে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০১০ সালের ১০ আগস্ট তাকে র্যাব সদর দপ্তরে পদায়ন করা হয়। শুরুতে তিনি প্রশাসনিক শাখায় কাজ করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে গোয়েন্দা শাখায় নেওয়া হয়। পরে তাকে জিয়াউল আহসানের দেহরক্ষী বা ‘রানার’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন বলে জানান।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, ইমরুল কায়েস ও জিয়াউল আহসানের মধ্যে পূর্বপরিচয় ছিল। ২০০৪ সালে কমান্ডো কোর্স এবং পরে প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নে কর্মরত থাকার সময় তিনি জিয়াউল আহসানের অধীনে কাজ করেন। পরে র্যাবে পুনরায় দেখা হলে জিয়াউল আহসান তার নাম ও যোগাযোগ নম্বর নেন এবং কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে গোয়েন্দা শাখায় পদায়ন করা হয়।
‘বস্তা’ নয়—ভেতরে ছিল নিথর দেহ:
র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের দেহরক্ষী ইমরুল কায়েস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে এক ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, রানার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি একটি মৃতদেহ সরানোর ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন।
ইমরুল কায়েস বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পর এক রাতে জিয়াউল আহসান তাঁকে র্যাব-১ কার্যালয়ের সামনে যেতে বলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি দুটি কালো মাইক্রোবাস দেখতে পান।
একটি মাইক্রোবাসে ওঠার পর তিনি দেখতে পান, সেখানে জিয়াউল আহসান, র্যাব-১-এর তৎকালীন সিও রাশেদ এবং ক্যাপ্টেন কাউসারসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়াউল আহসান তাঁকে জানান, গাড়ির পেছনে একটি ‘বস্তা’ আছে, সেটি ফেলে দিতে হবে।
ইমরুল কায়েস ট্রাইব্যুনালে বলেন, পরে গাড়িটি রাতের বেলা টঙ্গীর দিকে একটি রেললাইনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মাইক্রোবাসের পেছনের অংশ খোলা হলে তিনি ওই ‘বস্তা’ নামাতে গিয়ে বুঝতে পারেন, সেটি আসলে একটি ঠান্ডা মৃতদেহ।
এরপর অন্যদের সহায়তায় তিনি লাশটি রেললাইনের পাশে রাখেন বলে জানান। পরে জিয়াউল আহসানসহ উপস্থিতরা লাশটি রেললাইনের ওপর তুলে দেন। কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন ওই স্থান অতিক্রম করার পর তারা সেখান থেকে চলে যান বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। ইমরুল কায়েস আরও বলেন, ঘটনার পর কয়েক দিন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

