দেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে একটি গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে যেখানে অনেক ব্যাংক তাদের ঋণ বিতরণের সীমা অতিক্রম করে গ্রাহকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকগুলো বেশি লাভের আশায় এবং কিছু অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করেছে যার ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়ে চাপ বাড়ছে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতির ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরো তীব্র হচ্ছে এবং আমানতকারীরা বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাংক ঋণ-আমানত অনুপাতের (এডিআর) সীমা অতিক্রম করে ঋণ বিতরণ করেছে যা ব্যাংক খাতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর জন্য কিছু নির্দিষ্ট বিধিমালা নির্ধারণ করেছে। সেই বিধিমালার মধ্যে প্রচলিত ধারার ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৭ টাকা ঋণ দিতে পারে এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য এই সীমা ৯২ টাকা। তবে কিছু ব্যাংক এই সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করেছে যার ফলে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে তারা সমস্যা সম্মুখীন হচ্ছে।
একটি উদাহরণ হিসেবে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংক তার এডিআর সীমা ১১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা ২৬ টাকা ৫৬ পয়সা বেশি। ফলে ব্যাংকটি গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিছু সহায়তা পাওয়ার পর ব্যাংকটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে পদ্মা ব্যাংকও ঋণ বিতরণে সীমা অতিক্রম করেছে এবং এখন তা আদায় করতে পারছে না গ্রাহকদের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না। এবি ব্যাংক এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকও একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ঋণ-আমানত অনুপাতের সীমা অতিক্রম করলে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়তে পারে এবং গ্রাহকদের টাকাও ফেরত দিতে সক্ষম নাও হতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাংকগুলো লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে ঋণ বিতরণ করলে তা শুধু ব্যাংক খাতকে নয় গ্রাহকদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত তদারকি করে থাকে এবং প্রয়োজন হলে তাদেরকে ঋণ বিতরণ সীমা মানতে অনুরোধ জানানো হয়।

এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক এবং বেসরকারি বেসিক ব্যাংকও তাদের ঋণ বিতরণের সীমা অতিক্রম করেছে। জনতা ব্যাংকের এডিআর দাঁড়িয়েছে ৯৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংকের ৯২ দশমিক ৬২ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের এডিআর ১১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ১২৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এই অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ গ্রাহকদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরো বলেন ব্যাংকগুলোর জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন যাতে তারা নিয়ম মেনে ঋণ বিতরণ করে এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে বেশ কিছু ব্যাংকে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল যা বর্তমানে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এ কারণে ব্যাংক খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এখন পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের সংকট।
খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতিও বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংক খাতের প্রভিশন ঘাটতি এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়ে গেছে যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ আদায়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর তদারকি আরও কঠোর করলে এই সংকট কিছুটা হলেও কাটানো সম্ভব হতে পারে।

