বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ খান বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা বহন করছেন। তাঁর মূল বেতন ৬৮,২৮৩ টাকা হলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধের পর মাস শেষে হাতে পান মাত্র ১১,৩৭৪ টাকা ২৫ পয়সা। অথচ তাঁর দায়বদ্ধ ঋণের পরিমাণ ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার ৪৭০ টাকা।
কমিশনের মধ্যম সারির এই কর্মকর্তা ছয়টি আলাদা ঋণের কিস্তি বাবদ ৫৬,৯০৮ টাকা ৭৫ পয়সা পরিশোধ করছেন। এত কম আয়ে রাজধানীতে স্ত্রী ও দুই সন্তানের সংসার কীভাবে চালান তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৎভাবে এ পরিমাণ আয়ে চারজনের পরিবারের খরচ চালানো অসম্ভব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামুনুর রশিদ খান ২০০৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইউজিসিতে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যোগ দেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পান। ইউজিসির কর্মকর্তারা জানান, তিনি নিজেকে ইউজিসি চেয়ারম্যানের এপিএস হিসেবে পরিচয় দেন যদিও ইউজিসির সাংগঠনিক কাঠামোতে এ ধরনের পদ নেই। তিনি বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে চেয়ারম্যানের সঙ্গে থাকেন এবং আয়োজনে ভূমিকা রাখেন।
মামুনুর রশিদ খান বাড়ি নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ ১৩ লাখ ২১ হাজার ৩৮৭ টাকা ঋণ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, কিন্তু তাঁকে ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫২ টাকা অতিরিক্তসহ মোট ৬১ লাখ ৬৫ হাজার ৪১৩ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিস্তি পরিশোধের পরও তাঁর ঋণের স্থিতি ৫২ লাখ টাকার বেশি। সম্প্রতি তাঁকে অতিরিক্ত ৪ লাখ টাকা ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে যদিও এর আগে চারবার ঋণের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউজিসি বিভিন্ন কর্মকর্তাকে নিয়ম ভেঙে অতিরিক্ত ঋণ দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউজিসির পরিচালক জাফর আহম্মদ জাহাঙ্গীর ২৭ লাখ ৮১ হাজার ৭২২ টাকা ঋণ পাওয়ার যোগ্য হলেও তাঁকে ৪৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত ঋণসহ মোট ৬৭ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণকারীদের তালিকায় আরো আছেন অতিরিক্ত পরিচালক মো. আকরাম আলী খান, অফিস সহায়ক মির্জা হামিদুল ইসলাম, কম্পিউটার অপারেটর মো. আব্দুস সালামসহ আরও অনেকে।
ইউজিসির করপোরেট সাধারণ গৃহনির্মাণ ঋণ নীতিমালা অনুসারে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত ঋণের সীমা নির্দিষ্ট থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৭৫ লাখ টাকা, ষষ্ঠ থেকে নবম গ্রেডের জন্য ৬৫ লাখ টাকা ঋণের সীমা নির্ধারিত থাকলেও অনেকে নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত ঋণ নিয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঋণের সুরক্ষার জন্য জমি বা ফ্ল্যাট বন্ধক রাখার নিয়মও অনুসরণ করা হয়নি।
অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে মামুনুর রশিদ খান বলেন, ‘আমার মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে। তাদের পড়াশোনার খরচ চালাতেই ঋণ নিয়েছি, বাড়ি-গাড়ি কিনিনি।’
এ বিষয়ে ইউজিসির সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলাম জানান, মামুনুর রশিদ খান তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন, যা তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডের অংশ। তবে কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, ‘নির্ধারিত সীমার বাইরে ঋণ প্রদান অন্যায় হয়েছে, এটি আমরা খতিয়ে দেখব।’
ইউজিসির ঋণ অনিয়মের এই ঘটনা কমিশনের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করেছে। ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

