চট্টগ্রাম নগরের জামালখান ওয়ার্ডের মোমিন রোডের বাসিন্দা কিরণ দাশ স্বামীকে হারিয়েছেন ১৪ বছর আগে। তাঁর সংসার চলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রাপ্ত ভাতার ওপর। এই ভাতা অব্যাহত রাখতে প্রতি বছর সিটি করপোরেশন থেকে দ্বিতীয় বিয়ে না করার সনদ সংগ্রহ করে জমা দিতে হয় তাঁকে। কিন্তু এক মাস আগে আবেদন করেও এখনো সেই সনদ পাননি যার ফলে তাঁর ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে।
শুধু কিরণ দাশ নন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বিভিন্ন ওয়ার্ড কার্যালয়ে জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন, নাগরিক সনদসহ ১৭ ধরনের সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। আগে যেখানে এসব সনদ দিনে দিনেই মিলত এখন তা পেতে লেগে যাচ্ছে দুই সপ্তাহ থেকে মাসখানেক কখনো কখনো আরও বেশি সময়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন মাসেও সনদ মিলছে না। অথচ সিটি করপোরেশনের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, জন্মনিবন্ধন ও সংশোধিত জন্মনিবন্ধন দুই কার্যদিবসের মধ্যে দেওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আগে এসব সনদে স্বাক্ষর করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। কিন্তু গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অধিকাংশ কাউন্সিলর আত্মগোপনে চলে যান এবং ২৭ সেপ্টেম্বর সরকার তাদের অপসারণ করে। ৭ অক্টোবর থেকে চসিকের ১৩ কর্মকর্তাকে ওয়ার্ডগুলোর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয় যেখানে একেকজন কর্মকর্তা সর্বনিম্ন দুটি থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাদের ওপর কাজের চাপ বেড়েছে এবং নাগরিকদের আবেদন যাচাই-বাছাই করতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।
গত মঙ্গলবার ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ডে সরেজমিন দেখা যায়, কেউ কেউ প্রত্যাশিত সনদ নিয়ে ফিরছেন আবার কেউ হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ১৮ ডিসেম্বর বাবা মারা যাওয়ার পর ৯ জানুয়ারি ওয়ারিশ সনদের জন্য আবেদন করেছিলেন ওমর ফারুক কাজল। পরদিন ওয়ার্ড তদন্ত কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করলেও এক মাস পার হয়ে গেলেও তিনি ওয়ারিশ সনদ পাননি।
মোছাম্মৎ তাসনিয়া জানান, অনেক কাগজপত্র জমা দিয়েও ওয়ারিশ সনদ পেতে প্রায় তিন মাস লেগেছে। জন্মনিবন্ধন সনদ পেতেও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নাগরিকরা। ২৯ জানুয়ারি আবেদন করেও তিন সপ্তাহ পরেও জন্মনিবন্ধন পাননি মুহাম্মদ মিরাজ।
ওয়ার্ডটির জন্মনিবন্ধন সহকারী উমা চক্রবর্তী জানান, আবেদনকারীর কাগজপত্র সঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে জন্মনিবন্ধন দেওয়া হয়। তবে নাগরিক প্রমাণের কোনো কাগজপত্র ঘাটতি থাকলে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বেশি সময় লাগছে। ওয়ার্ডটির দায়িত্বপ্রাপ্ত আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা রক্তিম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
অন্যদিকে, নগরের ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় জন্মনিবন্ধন সহকারী শামীম মাহমুদ অনুপস্থিত। জন্মনিবন্ধনের জন্য অপেক্ষারত মো. মিশাত জানান, ২ ফেব্রুয়ারি আবেদন করেছিলেন কিন্তু এখনো সনদ পাননি। একই ওয়ার্ডের রুপম দাশ জানান, ৩০ জানুয়ারি আবেদন করে নাগরিক সনদ পেতে প্রায় এক মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সনদে স্বাক্ষর করছেন। ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলায় জন্মনিবন্ধনের আবেদন বেড়েছে ফলে কর্মকর্তাদের ওপর চাপও বেশি। যাচাই-বাছাই না করে সই করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে যেসব ওয়ার্ডে বেশি দেরি হচ্ছে সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগরের ২২ নম্বর এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইমতিয়াজ আলম জানান, ২০ নভেম্বর সংশোধিত জন্মনিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিলেন কিন্তু তিন মাস পার হলেও এখনো পাননি। ওয়ার্ডটির জন্মনিবন্ধন সহকারী রুমি রানী দাশ জানান, জেলা প্রশাসকের অনুমোদন পেতে সময় লাগায় এসব সনদ পেতে বিলম্ব হচ্ছে।
চট্টগ্রামের উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) মো. নোমান হোসেন বলেন, প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার আবেদন জমা হয়, যা একা তার পক্ষে স্বাক্ষর করা সম্ভব নয়। তাছাড়া রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় প্রতিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। তবে কেউ জরুরি প্রয়োজনে কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি তার কার্যালয়ে এলে তাৎক্ষণিকভাবে সনদ করে দেওয়া হয়।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ওয়ার্ড কার্যালয় থেকে জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধন, নাগরিক, চারিত্রিক, উত্তরাধিকার (ওয়ারিশ), আয়, অবিবাহিত, দ্বিতীয় বিয়ে না করা, পারিবারিক সদস্য, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার সত্যায়িত সনদসহ ১৭ ধরনের সেবা দেওয়া হয়। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অপসারণের পর থেকে এসব সেবা পেতে নাগরিকদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

