গরিব ও সাধারণ জনগণের জন্য ন্যায্যমূল্যে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। তবে এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটির যুগ্ম পরিচালক মো. হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে সরকারি টাকা আত্মসাৎ, পণ্য সরবরাহ ছাড়াই বিল পরিশোধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কালোবাজারে বিক্রি, আত্মীয়স্বজনের নামে ডিলারশিপ নেওয়া, ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ গ্রহণসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির চেয়ারম্যান বরাবর একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হুমায়ুন কবীর নিজেকে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আহসানুল হক টিটুর ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করতেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন তিনি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানে নেমে এসব অনিয়মের প্রমাণও মিলেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, টিসিবির পণ্য অবৈধভাবে বাজারজাত করে ও ডিলারদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়েছেন হুমায়ুন কবীর। মিরপুর ১০ ও ১১ নম্বরের মাঝখানে ৭.৫০ কাঠা জমি, টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার দুয়াজানি গ্রামে ২০ লাখ টাকার জমি কিনে সেখানে পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। এছাড়া একই এলাকায় আরো ১৫ লাখ টাকার জমি কিনেছেন। নারায়ণগঞ্জে তার স্ত্রী নূরে জান্নাতের নামে ৫.৫ শতাংশ জমি রয়েছে। মিরপুর পলাশ নগরে ছোটবোন কানিজ ফাতেমা, শ্বশুর গিয়াস উদ্দিনসহ আত্মীয়স্বজনের নামে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ কাঠার সম্পত্তি কিনেছেন।
এছাড়া নাগরপুর উপজেলার কেদারপুরে মায়ের নামে ২০ শতাংশ জমি, সাভারের আশুলিয়ায় মা, শাশুড়ি, বোনের স্বামীর নামে ৩১ শতাংশ জমি কিনেছেন। আশুলিয়ায় আরও ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ বন্ধুর সঙ্গে যৌথভাবে একটি বাণিজ্যিক জমিও কিনেছেন। মামাতো ভাই নয়নসহ আত্মীয়স্বজনের নামে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাটও রয়েছে তার।
কয়েকজন ডিলার জানিয়েছেন, হুমায়ুন কবীরের নিয়োগ দেওয়া কিছু ডিলার বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাদের কাছে তেল, চিনি, খেজুর অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবে তার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন নিতে হয়। কেউ ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ডিলারশিপ বাতিল করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
একটি সূত্র জানায়, ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের কারওয়ান বাজার শাখার একটি হিসাবের মাধ্যমে নিয়মিত ঘুষ লেনদেন করা হয়। ওই হিসাবে ‘ফুয়াদ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। এছাড়া ডিলার মনি নামে একজনের সঙ্গে হুমায়ুন কবীরের ২ কোটি টাকার ব্যবসায়িক বিনিয়োগ রয়েছে।
২০২৩ সালে রমজান মাসে টিসিবির বরাদ্দকৃত তেল, চিনি ও খেজুর পছন্দের ডিলারদের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন হুমায়ুন কবীর। নিয়মিত সরকারি ছুটির দিনেও তিনি অফিস করতেন, যা অনিয়মের সন্দেহকে আরো প্রবল করে তোলে।
টিসিবির এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সালে টিসিবির তেজগাঁও গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল, চিনি ও খেজুর বাইরে বিক্রি করা হয়। এ নিয়ে যখন আলোচনা শুরু হয়, তখনই ওই গুদামে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে ১০ টন সয়াবিন তেল ও ১০-১২ টন ছোলা পুড়ে যাওয়ার দাবি করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ তুলেছেন এটি পরিকল্পিত অগ্নিকাণ্ড।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চাইলে টিসিবির যুগ্ম পরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমার সাবেক স্ত্রী ও তার পরিবার আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আমাদের সন্তান জন্ম নেওয়ার পর তিনি পরকীয়ায় জড়িয়ে যান এবং নানা বিশৃঙ্খলার কারণে সংসার ছেড়ে চলে যান। এখন তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমার নামে যা সম্পত্তি আছে তা আমার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গরিব ও সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত পণ্য কালোবাজারে বিক্রি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা উচিত। টিসিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে না পারলে ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে পণ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

