বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তারা রয়েছেন। তবে অনেকেই নিষেধাজ্ঞার আগে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে যারা ইতোমধ্যেই বিদেশে, তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির দরকার কী?
গত সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক ব্যক্তি ইতোমধ্যে বিদেশে চলে গেছেন। দুদক জানিয়েছে, এসব ব্যক্তি দুর্নীতির অভিযোগের মুখে রয়েছেন। রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কেন?
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা ভারতে চলে যান। এরপরও গত ১১ মার্চ আদালতে তাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে দুদক। আদালত তা মঞ্জুর করে। তবে তারা তখন থেকেই বিদেশে অবস্থান করছেন।
এছাড়া সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিন্তু তিনি আগেই দেশ ছেড়ে সিঙ্গাপুরে চলে গেছেন।
আইনজীবীদের মতামত কী?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, আগে দুদক নিজেরাই বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিতে পারত। তবে হাইকোর্টের রায়ের কারণে এখন আদালতের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু যেসব ব্যক্তি আগেই বিদেশে চলে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার কোনো অর্থ নেই। এতে শুধু সময় ও সম্পদের অপচয় হয়। বরং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
অন্যান্য আলোচিত নিষেধাজ্ঞা-
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু তিনি আগেই ভারতে চলে গেছেন।
আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে দুদক নিষেধাজ্ঞা দেয়। কিন্তু তার দুবাই থাকার ভিডিও আগেই ছড়িয়ে পড়ে।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে তিনি অনেক আগেই যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন।
রাজশাহীর সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ছয় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ও তার পরিবারের ১১ সদস্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে তিনি অনেক আগেই সিঙ্গাপুরে গেছেন।
দুদকে কী বলছে?
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, অনেকের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত নয়। তাই আদালতের অনুমতি নিয়ে তাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক আইনজীবী মনে করেন, এটি অপ্রয়োজনীয়। কারণ যেসব ব্যক্তি আগেই চলে গেছে বিদেশে। তাদের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলবে না। বরং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন-
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে অবস্থান করার পরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘আইন অনুযায়ী দুদক যা করছে, তা ঠিকই করছে। তবে বিষয়টি বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেটি ভাবার দরকার আছে।’’
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে ঠিকই কিন্তু যারা পালিয়ে গেছেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না কেন?
তাহলে লাভ কি এই নিষেধাজ্ঞায়, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?

