খুলনার দাকোপ উপজেলার এক প্রান্তিক গ্রাম গুনারীর সরদারবাড়ির পুকুরঘাটে সন্ধ্যা নামে। পুকুরপাড়ে তখন পানি তুলছেন মীরা। তাঁর গায়ের ঘাম তখনো শুকায়নি। কারণ ঠিক তার আগে দিনমজুরের কাজ সেরে এসেছেন। মীরা ও তাঁর স্বামী দুজনেই দিনমজুর। কাজ শেষে হাঁটুপানিতে নেমে পানির হাঁড়ি ভরে আনতে হয় পুকুর থেকে। গ্রামের বাড়িগুলোতে সরবরাহযোগ্য কোনো নিরাপদ পানির উৎস নেই। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রামের শেষ প্রান্তের এই পুকুরই তাঁদের ভরসা। মীরা বলেন, ‘এখান থেকে পানি আনতে-যেতে ঘণ্টাখানেক লাগে। গরম বাড়ছে তাই চিন্তাও বাড়ছে। পানির ট্যাংক পাওয়ার জন্য অনেকের কাছে বলেছি কেউ দেয়নি।’
উপকূলের মানুষের এই দুরবস্থা নতুন নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলের ১৯ জেলার মধ্যে ১৮টিতেই দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। বিশেষ করে সুন্দরবনের সংলগ্ন এলাকার মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে। এখানকার পুকুরগুলো ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকেই এতটাই দূষিত হয়ে পড়েছে যে তাতে ফিটকিরি দিয়েও পানি পুরোপুরি খাওয়ার উপযোগী করা যায় না।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুলনায় বর্তমানে বিভিন্ন উৎস মিলিয়ে ৭৬ হাজার ৫৫৯টি পানির উৎস থাকলেও এর মধ্যে ১২ হাজার ৭৩টি অকেজো হয়ে গেছে। কার্যকর পুকুরভিত্তিক পানিশোধন পদ্ধতি ‘পন্ড স্যান্ড ফিল্টারের’ (পিএসএফ) অবস্থাও আশানুরূপ নয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক জায়গায় এগুলো আর কার্যকরভাবে কাজ করছে না।
পানি সংকটের সমাধানে সরকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রকল্প হাতে নেয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ‘উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন’ প্রকল্প চালু হয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে। এই প্রকল্পে খুলনার সাতটি উপজেলায় ৪০ হাজার ৫টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম স্থাপনের লক্ষ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত ১৫ হাজার ৮৩৩টি সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ চলমান।
কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। সরকারের দেওয়া ৩ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক যেন হয়ে উঠেছে সোনার হরিণ যার পেছনে ছুটছে উপকূলের হাজারো মানুষ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ বা ঘনিষ্ঠতা ছাড়া এই ট্যাংক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকক্ষেত্রে ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে। অথচ ট্যাংকের গায়ে স্পষ্টভাবে লেখা, ‘ক্রয়-বিক্রয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ’। তা সত্ত্বেও চলে টাকার বিনিময়ে বরাদ্দ।
দাকোপ উপজেলার কালাবগী গ্রামের বিকাশ মণ্ডল নদীভাঙনের কারণে বারবার ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন ঝুলন্ত ঘরে বাস করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা পানি একটু চেপেচুপে খাই। দেড় গেলাস খাইলে ভালো হয়, দেখা গেল এক গেলাসে সেরে দিলাম।’
জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় এখন পর্যন্ত স্থাপিত উৎসগুলোর মধ্যে ২৪ হাজার ১১২টি গভীর নলকূপ, ১৩ হাজার ৪২৬টি অগভীর নলকূপ, ১ হাজার ৩৯০টি পিএসএফ, ৩২ হাজার ৬৩৬টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ইউনিট রয়েছে। এর বাইরেও আরও কিছু ইউনিট রয়েছে রিভার্স অসমোসিস, সোলার ডি-স্যালানাইজেশন, এসএসটি ও পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের নিয়ম অনুযায়ী, ট্যাংক বরাদ্দ দেওয়ার জন্য প্রথমে উঠান বৈঠক, পরে ওয়ার্ডসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়াটসান কমিটির মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন করার কথা। এরপর তা উপজেলা পর্যায়ে যাচাইয়ের মাধ্যমে বরাদ্দ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব কিছুই মানা হয়নি। সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানেরা নিজস্ব তালিকা তৈরি করে দিয়েছেন। এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) তত্ত্বাবধানে বিতরণ শুরু হলেও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত হয়নি।
দাকোপে বরাদ্দ পাওয়া ৫ হাজার ৮২৬টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেমের মধ্যে প্রথম তিন ধাপে ২ হাজার ৫৭৪টি এবং পরের তিন ধাপে ২ হাজার ৪৪৩টি ট্যাংকের অর্ধেক করে সুপারিশ করেছিলেন খুলনা-১ আসনের সাবেক দুই সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস ও ননী গোপাল মণ্ডল। শেষ ধাপের ৮০৯টির মধ্যে ননী গোপাল মণ্ডল তালিকা জমা দেওয়ার আগেই সরকার পরিবর্তন হয়ে যায়।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধিদের প্রভাবশালী অনুসারীরা ট্যাংক বরাদ্দের নামে অর্থনৈতিক লেনদেন করছেন। কেউ কেউ আবার উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস থেকে বরাদ্দের তালিকা জেনে নিয়ে যাঁদের নাম তালিকায় আছে তাঁদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করেন। রামনগরের কানাই মণ্ডল জানান, তিনি ও তাঁর স্বজনদের জন্য মৃণাল হালদার নামের এক ব্যক্তির কাছে আট হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্যাংক না পাওয়ায় তিন হাজার টাকা ফেরত পেয়েছেন।
গুনারীর সুমিত্রা সরদার জানান, আগের মেম্বার ও তাঁর ঘনিষ্ঠ একজনের কাছে দুই দফায় টাকা দিয়েও ট্যাংক পাননি। এ বছর টাকা দিয়ে একটিবারে একটি ট্যাংক পেয়েছেন। তবে কার মাধ্যমে সেটি এসেছে তা জানাতে পারেননি।
স্থানীয় ইউপি সদস্যদের অনেকে অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যানেরা এককভাবে বরাদ্দ ভাগ করে থাকেন। কৈলাসগঞ্জ ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য বলেন, ‘এসব লেনদেন ওপেন সিক্রেট। চেয়ারম্যানরা নিজেদের পছন্দের লোকদের দেন। আমরা বরং নাম দিতে পারি না।’
শুধু দরিদ্র মানুষই নন সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের বাড়িতেও সরকারি ট্যাংকের উপস্থিতি দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, উপজেলার ৩০ জন জনপ্রতিনিধি এবং অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে সরকারি পানির ট্যাংক রয়েছে। কৈলাসগঞ্জের ইউপি সদস্য অমিত মণ্ডল জানান, তাঁদের প্রত্যেককে চেয়ারম্যান একটি করে ট্যাংক দিয়েছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস দাকোপ এলাকায় কম যেতেন বলে তাঁর অনুসারী জনপ্রতিনিধিরাই বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ছিলেন। দলের পরিচয়ে যাঁরা আসতেন, তাঁদেরও ট্যাংক পেতে সহায়তা করতেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রে এসব অনুসারীরা মানুষকে ট্যাংক পাইয়ে দিয়ে টাকা নিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু টাকা নয়, অনেক সময় সুন্দরবনের টাটকা মাছ বা খাঁটি মধুও লেনদেনের অংশ হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। এভাবে একদিকে জলবায়ু সংকটে বিপর্যস্ত মানুষ পানির জন্য হাহাকার করছেন অন্যদিকে সরকারি সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না প্রকৃত প্রাপকের হাতে। প্রান্তিক মানুষের জীবনে নিরাপদ পানি এখন যেন দুর্লভ স্বপ্ন।

