বাংলাদেশের চার পাইলটের বিরুদ্ধে লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম, ভুয়া ফ্লাইট রেকর্ড জমা ও নিজেই নিজের লাইসেন্সে সই করার মতো অভিযোগ উঠেছে। চাঞ্চল্যকর এই তথ্য উঠে এসেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর তদন্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বরাতে। তবে এতসব অনিয়ম সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টদের লাইসেন্স এখনও বহাল রয়েছে।
লাইসেন্সপ্রাপ্ত, কিন্তু নেই যোগ্যতা-
২০২৩ সালের মার্চে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী একাডেমি থেকে স্নাতক আব্দুর রহমান আকন্দ পাইলটদের সর্বোচ্চ যোগ্যতা ‘এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স’ (এটিপিএল) পান। অথচ নথি বলছে, তিনি এই লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় ২৫০ ঘণ্টার ফ্লাইট সময়ের অর্ধেকও পূরণ করেননি। তিনি একা উড়েছেন মাত্র ২৬ ঘণ্টা এবং তত্ত্বাবধানে আরও ১২৮ ঘণ্টা। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, লাইসেন্স পেতে একা কমপক্ষে ৭০ ঘণ্টা কিংবা তত্ত্বাবধানে মোট ৫০০ ঘণ্টা উড়াতে হয়।
তাঁর দাবি অনুযায়ী, তিনি বিমানবাহিনী থেকে ছাড় পাওয়ায় নিয়মে শিথিলতা পেয়েছেন। তবে তাঁর দেওয়া তথ্যে অসংখ্য অসঙ্গতি রয়েছে। এমনকি তিনি নিজেই নিজের দাবির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য নথি উপস্থাপন করতে রাজি হননি।
চেক পাইলট হয়েও উড়াননি সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজ-
আরেক পাইলট, ক্যাপ্টেন কবির-উল-আলম, কখনো ফকার-৫০ উড়াননি। অথচ তাঁকে এই উড়োজাহাজের ‘ডেজিগনেটেড চেক পাইলট’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বেবিচক। অথচ আইসিএও ও বেবিচক নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজে অন্তত ৭৫০ ঘণ্টা প্রধান পাইলট হিসেবে উড়ার অভিজ্ঞতা ছাড়া চেক পাইলট হওয়া সম্ভব নয়।
তাঁর রেকর্ডে দেখা গেছে, ফকার-৫০-এর ফ্লাইট সিমুলেটর সেশন সম্পন্ন করলেও বাস্তবে কোনো ফ্লাইট নেই। বেবিচক বলছে, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে তাঁকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্কাই ক্যাপিটালের সুপারিশপত্র বলছে, তাঁর অভিজ্ঞতা দুই হাজার ঘণ্টা নয় বরং অনেক কম।
সরাসরি জালিয়াতি: ভুয়া ফ্লাইট ঘণ্টার রেকর্ড-
ইউএস-বাংলার সাবেক পাইলট ক্যাপ্টেন নুরউদ্দিন আল মাসুদের বিরুদ্ধে তো সরাসরি ফ্লাইট রেকর্ড জালিয়াতির অভিযোগ উঠে আসে। ২০২২ সালে বেবিচকের তদন্তে দেখা যায়, মাসুদ একাধিকবার মিথ্যা ফ্লাইট ঘণ্টা দেখিয়েছেন।
তিনি ডিএইচসি-২ নামের একটি একক পাইলটচালিত উড়োজাহাজে ডানদিকে বসে ৭৬২ ঘণ্টা উড়েছেন বলে দাবি করেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এছাড়া ফিলিপাইনে প্রশিক্ষণের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও- আরও শত শত ঘণ্টার ফ্লাইট চালানোর ভুয়া রেকর্ড দেন তিনি।
এ নিয়ে ফিলিপাইনের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও নিশ্চিত করে যে মাসুদের ফ্লাইট রেকর্ড জাল। তবুও তাঁর লাইসেন্স এখনও বাতিল হয়নি।
নিজেই নিজের লাইসেন্সে সই!
প্রকাশ্যে এসেছে স্বার্থের দ্বন্দ্বের একটি দৃষ্টান্তও। সাবেক পরিচালক (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশনস) চৌধুরী মো. জিয়া-উল-কবীর নিজেই নিজের এটিপিএল লাইসেন্সে সই করেছেন। ২০১৮ সালের লাইসেন্সে তাঁর নিজের নাম, পদবী, সিল ও স্বাক্ষর দেখা যায়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বেবিচকের বর্তমান চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবির ভূঁইয়া জানান, অনুমোদনের মূল ক্ষমতা চেয়ারম্যানের হলেও লাইসেন্সে সইয়ের দায়িত্ব তখন ওই পরিচালকের ওপর ছিল।
বেবিচকের অবস্থান
সবকিছুর পরও বেবিচক বলছে, এখানে এমন কোনো নিয়ম লঙ্ঘিত হয়নি, যা উড়োজাহাজ চলাচলকে অনিরাপদ করে তুলেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব অনিয়ম আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের এভিয়েশন নিরাপত্তার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
এ বিষয়ে আইসিএও বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণের মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষণ:
এমন ঘটনায় পাইলটদের দক্ষতা, সুরক্ষা মান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা- সবই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যে লাইসেন্স কারও জীবন রক্ষা ও আকাশপথের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য, তা যদি অনিয়মের মাধ্যমে মেলে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত নয়- জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।

