শাহরিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর উন্মোচিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গড়ে ওঠা ভয়াবহ অপরাধজগৎ। প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ কেজি গাঁজা বিক্রি, এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রিত মাদকচক্র, পুলিশ ও রাজনীতির ছত্রচ্ছায়া, অস্ত্রধারী অপরাধী, ছিনতাই ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের রাজত্ব- সব মিলিয়ে উদ্যানটি হয়ে উঠেছিল এক ভয়ংকর অন্ধকার গহ্বর। প্রশাসনিক অভিযানের পরও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি মাদক কারবার। ফলে নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়ে এখনই কঠোর পদক্ষেপ সময়ের দাবি।
ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও নাগরিক জীবনের অবসরের অন্যতম স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এখন আর শুধু প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রশান্তির আশ্রয় নয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যাকাণ্ডের পর উদ্যানটি নিয়ে উদ্ভূত বিতর্ক ও তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ মাদক সাম্রাজ্যের চিত্র। যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০–৪০ কেজি গাঁজা বিক্রির ঘটনা ঘটত। পুরো এলাকাটি ছিল একপ্রকার ‘অভয়ারণ্য’ মাদক কারবারিদের জন্য।
গভীর অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত তিনটি চক্র- মেহেদী, পারুলী আক্তার ওরফে পারুল এবং নবী– সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে মাদকের নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাঁরা এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁদের হয়ে কাজ করত ৮–১০ জন করে বিক্রেতা। পুরো মাদক কারবারে জড়িত ছিল অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি।
তাঁরা ‘গ্রিপ’ নামে পরিচিত, যারা প্রতিদিন ৩০-৪০ কেজি গাঁজা উদ্যানজুড়ে সাদা কাগজে মুড়িয়ে ‘পুরিয়া’ আকারে বিক্রি করত। বিক্রির পাশাপাশি মাদক সংগ্রহ ও পরিবহন প্রক্রিয়াতেও জড়িত থাকত আরও অনেকে।
শুধু গাঁজাই নয়, উদ্যানজুড়ে সীমিত পরিসরে হেরোইন ও ইয়াবার বিক্রিও চলত। রমনা কালীমন্দিরের পেছনের অংশ হেরোইনের আখড়া হিসেবে পরিচিত ছিল। তরুণ-তরুণীদের মাদক সেবনের ‘নিরাপদ’ স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল উদ্যানের দক্ষিণ–পশ্চিম কোণ। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত চলে মাদক সেবন ও লেনদেন।
এখানে শুধু মাদক নয়, সক্রিয় ছিল মোটরসাইকেল চোর চক্র, ছিনতাইকারী দল ও ব্ল্যাকমেইলাররা। এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের নাম ব্যবহারকারী কিছু তরুণ, যাদের পেছনে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাদক চক্রগুলোর পেছনে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য অভিযানের সময় জব্দ করা গাঁজার অংশ পুনরায় কারবারিদের কাছে বিক্রি করতেন বলেও জানা যায়। শাহবাগ থানার একাধিক এসআইয়ের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ রয়েছে।
১৩ মে দিবাগত রাত ১২টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চের পাশে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র ও ছাত্রদল নেতৃবৃন্দের একজন ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, মেহেদী গ্রুপের সদস্যরা প্রথমে শাহরিয়ারকে টেজার দিয়ে আঘাত করেন এবং পরে সুইচ গিয়ার (একধরনের চাকু) দিয়ে উরুতে আঘাত করেন। এই হামলায় জড়িতদের মধ্যে আরো কিছু মাদকসেবীও উপস্থিত ছিল যারা ভুল করে শাহরিয়ারকে ‘প্রতিপক্ষ’ ভেবে হামলায় অংশ নেয়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক কারবারিরা নিজেদের আত্মরক্ষার্থে ও প্রতিপক্ষ দমনে নিয়মিতভাবে সুইচ গিয়ার ও টেজার সঙ্গে রাখেন। ব্যবসায় যুক্ত তিন ব্যক্তির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, এসব অস্ত্র নিয়ে তাঁরা প্রায়ই সেখানকার সাধারণ দর্শনার্থীদের ভয়ভীতি দেখান বা হামলা করেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শাহরিয়ার হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্তে উদ্যানে মাদকসহ সব ধরনের অপরাধপ্রবণতার দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে ডিবি ও ডিএমপির কর্মকর্তাদের বৈঠকে জানানো হয়েছে, তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের দেওয়া তথ্যমতে আরও কয়েকজনকে খুঁজে বের করতে অভিযান চলছে।
শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর সরকার নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোগ নেয়। ১৫ মে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ দোকান ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু তাতেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি মাদকের কারবার।
সূত্রগুলো জানায়, এখনো উদ্যানের কিছু অংশে গোপনে গাঁজা বিক্রি চলছে। পারুল, মেহেদী ও নবীর দল চাপে থাকলেও- বিকল্পদের মাধ্যমে মাদক বিক্রি অব্যাহত রয়েছে।
রাজধানীর একেবারে মাঝখানে শাহবাগ থানার লাগোয়া একটি ঐতিহাসিক উদ্যান কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হলো, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের দক্ষতা ও সদিচ্ছা নিয়ে। জনসাধারণের কাছে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া উদ্যানটি কিভাবে একটি অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল, সেটাই এখন অন্যতম আলোচনার বিষয়।
নিয়মিত দর্শনার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো একটি জায়গা যদি নিরাপদ না থাকে- তাহলে শহরের আর কোথায় নিরাপদে হাঁটা যায়?

