জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ি থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় ‘মৃত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাস্তবে জীবিত একজন মানুষকে। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার বাসিন্দা সুলাইমান সেলিম জানেনই না- তাঁকে ‘শহীদ’ দেখিয়ে হত্যা মামলা হয়েছে। ঠিকানা যাচাই করতে গিয়ে পুলিশ যখন তাঁর কাছে যায়- তখনই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। জীবিত সেলিমের নামে মিথ্যা মৃত্যুর মামলা দাখিল হওয়ার ঘটনা ঘিরে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সুলাইমান সেলিম নিজেই হতবাক ও ক্ষুব্ধ। তাঁর ভাষায়, “খুব কষ্ট ভিতরে। যদি বুক ছিড়া দেখাইবার পারতাম- আমি জীবিত থাকতে মৃত…. হামসার বড় ভাই বাংলাদেশের সরকার রে দেখাইছে… আমি মারা গেছি। এর থেকে দুঃখ কী আছে পৃথিবীতে?”
তিনি জানান, গত বছরের ৩ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ‘গুলিতে নিহত’ হওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে ‘শহীদ’ বলা হয়েছে। অথচ তিনি তখনও জীবিত ছিলেন এবং বর্তমানে সুস্থভাবেই ফুলবাড়িয়ায় বসবাস করছেন।
সেলিম বলেন, “আমি নিশ্চিত আমি ওই সেলিম। যদি পুলিশ জানার আগে আমাকে মেরে ফেলত, তাহলে তো আমি সরকারি লাশ হইয়া যাইতাম।”
বিস্ময়ের আরও গভীরে আছে অভিযোগকারী পরিচয়ের প্রশ্ন। তদন্তে উঠে এসেছে, মামলাটি করেছেন সুলাইমান সেলিমেরই বড় ভাই মোস্তফা কামাল। এ ঘটনায় সেলিম ও তাঁর স্বজনদের মধ্যে পারিবারিক দ্বন্দ্বের ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলার সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন সেলিমের আরও দুই ভাই। নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে সেলিম এরই মধ্যে পাঁচবার ঢাকায় হাজিরা দিয়েছেন, এর মধ্যে চারবার যাত্রাবাড়ি থানায়, একবার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দপ্তরে।
সেলিম অভিযোগ করেন, “এই মামলাটা করেছে শুধু আমাকে মারার জন্য। যদি এর মাঝখানে আমাকে মাইরা ফেলতে পারত, তাহলে অই যাগরে আসামি করছিল ৪১ জন আর অজ্ঞাত দেড়-দুইশ জন, তারা অযথা জেল খাটত।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। পাশাপাশি ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ শীর্ষস্থানীয় ৪১ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম রয়েছে মামলায়। এছাড়া দেড় থেকে দুই শতাধিক অজ্ঞাত ব্যক্তি, যাদের মধ্যে দলীয় অঙ্গসংগঠনের অনেকেই আছেন- তাদেরও আসামি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ি থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলাটি এখনও রুজু রয়েছে এবং বর্তমানে তদন্ত করছে ডিবি। ডিবির একজন তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলার বাদী এখন পলাতক এবং সেলিম সত্যিই জীবিত কি না তা যাচাই করতে আদালত ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন এ ঘটনাকে “অকল্পনীয়” ও “জুলাই-আগস্টের শহীদদের চ্যালেঞ্জ করার মতো” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “জীবিত মানুষকে শহীদ বানিয়ে তার ভাইয়েরাই মামলা করছে- এটা শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, শহীদদের সম্মানকেও কলুষিত করে।”
আইনজীবী এলিনা খান বলেন, “এভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দিয়ে নিরীহ মানুষদের জড়িয়ে শুধু ন্যায়বিচার নয় বরং বিচারব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “মিথ্যা মামলার মাধ্যমে যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই ধরনের কার্যক্রম করছে, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
সেলিমের মতো ঘটনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আরও উঠে এসেছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা দেওয়ার অভিযোগ। কয়েকদিন আগেই অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়ার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এমনকি সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী, খেলোয়াড় ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে।
নূর খান লিটন বলেন, “এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে এমন ব্যক্তিদের নাম দেওয়া হচ্ছে, যারা ঘটনার সময় উপস্থিতই ছিলেন না। সাংস্কৃতিক কর্মী, ক্রিকেটার, সাংবাদিক- সবাইকে টার্গেট করা হচ্ছে। এর পেছনে কখনো চাঁদাবাজি, কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য- দুই রকম প্রবণতা রয়েছে।”
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মামলা দায়ের হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি হত্যা মামলা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সুষ্ঠু তদন্ত ও যাচাই না করে এভাবে হত্যা মামলা দায়ের করলে সাধারণ মানুষের মনে বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে।
এ বিষয়ে এলিনা খান বলেন, “মিথ্যা মামলার প্রবণতা ঠেকাতে এখনই রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় পর্যায়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে এসব মামলা পর্যালোচনা করতে হবে।”
জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে হত্যার মামলা দাখিল করার মতো ঘটনা শুধু আইনের অপব্যবহার নয়, এটি এক গভীর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকেত। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, পারিবারিক বিরোধ কিংবা দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে এমনভাবে বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহারের প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, সম্মান এবং অধিকার- তিনটিই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই এই মুহূর্তে দ্রুত তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং বিচারিক স্বচ্ছতার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি।

