একসময় মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বে থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু এখন সেই কর্মকর্তাই প্রায় ১৪ মাস ধরে কারাগারে বন্দি। ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামকে ঘিরে নরসিংদীর জুলাই আন্দোলনের একটি ঘটনায় নতুন করে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে এসেছে।
অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নরসিংদীতে সংঘটিত একটি গুলিবর্ষণের ঘটনার সঙ্গে তাকে জড়ানো হয়েছে। তবে তার পরিবার, সহকর্মী এবং কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে তাকে অভিযুক্ত করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন চলাকালে ১৭ জুলাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে নরসিংদীর জেলখানা মোড় এলাকায় পাঠানো হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফিরে যান। তার দাবি, পরদিন ১৮ জুলাই তিনি আর ঘটনাস্থলে যাননি এবং পুরো সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সার্কিট হাউস এলাকায় অবস্থান করেন।
সাইফুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কোনো পুলিশি অভিযানে অংশ নেননি, কোনো বাহিনীকে নির্দেশও দেননি। কিন্তু কয়েক দিন পর একটি প্রশাসনিক নথিতে দেওয়া তার স্বাক্ষরই তাকে জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করে।
তিনি দাবি করেছেন, ২২ জুলাই রাতে তাকে একটি এমসিসি ফরমে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। শুরুতে আপত্তি জানালেও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নির্দেশের কারণে তিনি স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে সেই নথিকে কেন্দ্র করেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, এমসিসি ফরম মূলত দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন, দায়িত্বের সময়কাল ও কার্যক্রমের বিবরণ সংরক্ষণের একটি নথি। এটি সরাসরি গুলিবর্ষণের অনুমতি বা নির্দেশনার দলিল নয়। ফলে এ ধরনের নথিতে স্বাক্ষর দেওয়া মানেই গুলির নির্দেশ দেওয়া—এমন ব্যাখ্যা নিয়ে আইনি মহলেও আলোচনা রয়েছে।
এদিকে নরসিংদীর ওই ঘটনায় নিহত কিশোর তাহমিদ ভূঁইয়ার পরিবারের করা প্রাথমিক অভিযোগে সাইফুল ইসলামের নাম ছিল না বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে তদন্ত প্রতিবেদনে তার নাম যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সংগঠকও বলেছেন, তারা সেখানে সাইফুল ইসলামকে দেখেননি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গুলিবর্ষণের সময় ঘটনাস্থলে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল।
তৎকালীন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, আন্দোলনের তীব্রতার কারণে জেলার অধিকাংশ ম্যাজিস্ট্রেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কিংবা সার্কিট হাউস এলাকায় অবস্থান করছিলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাইফুল ইসলামকেও সেদিন একাধিকবার প্রশাসনিক এলাকায় দেখা গেছে।
তবে তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন এবং সেই তালিকায় সাইফুল ইসলামের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ঘটনার ফলে শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত জীবনই নয়, তার পরিবারও গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে থাকায় তার স্ত্রী ও ছোট সন্তানকে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
আইন ও প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, এমন সংবেদনশীল মামলায় প্রত্যক্ষ প্রমাণ, প্রযুক্তিগত তথ্য, মোবাইল লোকেশন, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র গভীরভাবে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কি না, তার ভূমিকা কী ছিল এবং প্রশাসনিক নথিতে স্বাক্ষরের প্রকৃত অর্থ কী—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মামলাটির গুরুত্ব শুধু একজন কর্মকর্তার ভাগ্য নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা, আইনের শাসন এবং বিচারিক স্বচ্ছতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। তাই সব পক্ষের বক্তব্য, প্রমাণ এবং ঘটনার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

