মুন্সিগঞ্জে ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর মোহনায় শাহ সিমেন্টের অবৈধ দখল বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। বালু ফেলে নদী ভরাট, বিশাল কংক্রিট দেয়াল নির্মাণ এবং ক্লিংকারের ধুলো ও বর্জ্য নিষ্কাশনের মাধ্যমে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ও বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এবং মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের একাধিক প্রতিবেদনে (২০১৮, ২০১৯, ২০২৩) শাহ সিমেন্টকে নদী দখলকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
দখলের বিবরণ-
-
অবৈধ দখল: শাহ সিমেন্ট ২০০২ সালে কারখানা স্থাপনের পর থেকে ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর মোহনায় বালু ও মাটি ফেলে প্রায় ২৪ একরের বেশি নদীর জমি দখল করেছে। মুন্সিগঞ্জ সদরের মিরেরসরাই মৌজায় আরএস দাগ নম্বর ১৮৪ এবং পূর্ব মুক্তারপুর মৌজায় আরএস দাগ নম্বর ৩০১-৩০৮ নদী হিসেবে চিহ্নিত, যা বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন। তবে ২০২৪-২৫ সালের জরিপে দখলের পরিমাণ আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
-
পরিবেশগত ক্ষতি: কারখানার ক্লিংকার ধুলো ও ৪ মিটার ব্যাসের পাইপ দিয়ে নিষ্কাশিত তরল বর্জ্য নদীর পানি দূষিত করছে। ফ্লাই অ্যাশের দূষণে মাছ, ডলফিন এবং পরিযায়ী পাখির সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। নদীর নাব্যতা কমে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
-
নদীর প্রবাহে বাধা: বালু ভরাট ও বিশাল স্থাপনার কারণে নদীগুলোর প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যা পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিআইডব্লিউটিএ’র চিঠি (৪ মার্চ ২০২৫) এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে এই ক্ষতি উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি প্রতিবেদন ও আইনি অবস্থান-
-
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন: ২০১৮ ও ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে শাহ সিমেন্টকে নদী দখলকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০১৯ সালে বলা হয়, কোম্পানিটি ২৪ একর নদীর জমি ভরাট করে কারখানা বিস্তৃত করেছে, যা নদীর প্রবাহ ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে।
-
মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসন: ২০১৯ সালে ৫০টি দখলদারের তালিকায় এবং ২০২৩ সালে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় শাহ সিমেন্টকে প্রধান দখলদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের জরিপে দখলের পরিমাণ আরও বেশি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
-
হাইকোর্টের রায়: ২০০৯ সালের একটি রায়ে হাইকোর্ট নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে বলেছে, নদীর জমি সিএস ও আরএস রেকর্ডের ভিত্তিতে চিহ্নিত করতে হবে। এসএ ও বিএস রেকর্ড অপ্রামাণ্য। এই রায় অনুযায়ী, নদীর চর বা ভরাট জমিও সরকারি মালিকানাধীন।
-
বিআইডব্লিউটিএ: শাহ সিমেন্ট ২০০৪ সাল থেকে ১১.২৮ একর নদীতীরবর্তী জমির ইজারা নিয়েছে, যার মেয়াদ জুন ২০২৫-এ শেষ হবে। তবে, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে তারা নদী ভরাট ও দূষণ করছে।
শাহ সিমেন্টের দাবি-
শাহ সিমেন্ট নদী দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে:
-
তারা আইন মেনে কাজ করে এবং বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে নদীতীরবর্তী জমির ইজারা রয়েছে।
-
সিএস রেকর্ডের পর নদীর প্রবাহ পরিবর্তিত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক জরিপে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে তারা এই দাবির সমর্থনে কোনো নথি প্রকাশ করেনি।
-
বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন বলে তারা বিস্তারিত মন্তব্য এড়িয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের তদন্তে দেখা যায়, সিএস, আরএস এবং এসএ রেকর্ডে দখলকৃত জমি নদী হিসেবে চিহ্নিত। এসএ রেকর্ডে একটি ছোট অংশ ঘরবাড়ির সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হলেও- ভূমি মন্ত্রণালয় এটিকে অপ্রামাণ্য বলে বিবেচনা করে।

স্থানীয় প্রভাব-
-
নদীর জীবন্ততা হ্রাস: স্থানীয়রা জানান, ২০০২ সালের আগে ধলেশ্বরী ছিল মাছ ধরা ও জীবিকার উৎস। দখলের পর নদী সংকুচিত হয়েছে, মাছ ও জীববৈচিত্র্য কমেছে।
-
পরিবেশ দূষণ: ক্লিংকার ধুলো ও বর্জ্য নদীর পানি ও বাতাস দূষিত করছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।
-
নাব্যতা সংকট: বালু ভরাটের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ।
সরকারি পদক্ষেপের অভাব-
-
জেলা প্রশাসন: মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রেজাউল করিম জানান, সার্ভে শেষ হয়েছে এবং তদন্তের পর শাহ সিমেন্টকে নোটিশ দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক ফাতেমা তুল জান্নাত বলেন, বিস্তৃত তদন্ত চলছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
-
বিআইডব্লিউটিএ: নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের উপপরিচালক মোবারক হোসেন জানান, ডিজিটাল জরিপ শেষ হয়েছে এবং শীঘ্রই সীমানা খুঁটি বসানো হবে। তবে অতীতে মৌখিক সতর্কতা ও ছোটখাটো উচ্ছেদ অভিযান ছাড়া কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
-
নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন ২০২৪ সালে দখল নিশ্চিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, তবে অগ্রগতি স্পষ্ট নয়।

আইনি ও নীতিগত প্রেক্ষাপট-
-
হাইকোর্টের নির্দেশনা: ২০০৯ সালের রায়ে নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে বলা হয়, সিএস ও আরএস রেকর্ডের ভিত্তিতে নদীর জমি চিহ্নিত করতে হবে। শাহ সিমেন্টের দখল এই রায় লঙ্ঘন করে।
-
বন্দর আইন: বালু ভরাট ও বর্জ্য নিষ্কাশন বন্দর আইন ১৯০৮ এবং বিধিমালা ১৯৬৬ লঙ্ঘন করে।
-
নদী রক্ষা কমিশন: সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার জানান, তিনি ২০১৯ সালে দখল নিশ্চিত করে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
-
অন্তর্বর্তী সরকার: পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, ১৩টি নদী দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা তালিকায় থাকলে ফলাফল দেখা যাবে।
প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা-
-
স্থানীয় বাসিন্দা: মোল্লারচরের বাসিন্দারা জানান, শাহ সিমেন্ট ধীরে ধীরে রাতের আঁধারে বালু ফেলে নদী দখল করেছে, যা তাদের জীবিকা ও পরিবেশের ক্ষতি করেছে।
-
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ: হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনের উচ্ছেদের এখতিয়ার থাকলেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি- তা প্রশ্নবিদ্ধ।
-
পরিবেশবিদরা: নদীর দখল ও দূষণ বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
শাহ সিমেন্টের দখল ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর নাব্যতা, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। সরকারি প্রতিবেদন ও হাইকোর্টের রায় সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থার অভাব নদী রক্ষার প্রতিশ্রুতির দুর্বলতা প্রকাশ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের নদী দখলমুক্ত করার উদ্যোগ এই সমস্যার সমাধানে একটি সুযোগ হতে পারে, তবে দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

