সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এখন কলকাতায়। এক সময়ের প্রভাবশালী এই আওয়ামী লীগ নেতা, বর্তমানে অবস্থান করছেন নিউ টাউনের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি সেখানে বসেই নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন চোরাচালান সিন্ডিকেটে।
তথ্য বলছে, রাজনীতি শুরুর আগেই তাজুল ইসলামের ব্যবসা ছিল চোরাচালান কেন্দ্রিক। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবারও সেই পুরনো পথে ফিরেছেন তিনি। আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে চোরাচালান রুটে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তাতে নতুন করে সক্রিয় হন তাজুল। কলকাতার পুরনো সাথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবারও গড়ে তোলেন নেটওয়ার্ক।
কলকাতা থেকেই সব নিয়ন্ত্রণ
তাজুল ইসলাম বর্তমানে কলকাতা থেকেই পুরো চক্র পরিচালনা করছেন। নানা সূত্রে জানা গেছে, তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে ঢাকার বিনিয়োগ, বিদেশে অর্থ পাচারসহ সব কর্মকাণ্ড তদারকি করেন তিনি। স্ত্রী ফৌজিয়া ইসলাম, এপিএস ও ছোট ভাই রয়েছেন দুবাইয়ে। সেখানেই তাজুলের রয়েছে বিশাল পরিমাণ সম্পদ। চারটি অ্যাপার্টমেন্ট, নানা নামে বিনিয়োগ, বাড়ি ও ব্যবসা—সবই পরিচালিত হচ্ছে বিশ্বস্তদের মাধ্যমে।
তবে শুধু দুবাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডাতেও রয়েছে তাঁর সম্পদ। নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় রয়েছে দুটি বাড়ি। মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। টরন্টোতেও আছে একটি বাড়ি, যেটি দেখাশোনা করেন একজন কেয়ারটেকার।
ঢাকায় শতাধিক ফ্ল্যাট ও দোকান
দেশেও তাঁর নামে-বেনামে রয়েছে বিপুল সম্পদ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকাতেই তাজুল ইসলামের নামে-বেনামে রয়েছে অন্তত ৪২টি ফ্ল্যাট এবং ৫০টির বেশি দোকান। এসব বিনিয়োগ গৃহকর্মী, সহকারী ও এমনকি গাড়িচালকের নামে করা হয়েছে।
গাড়িচালক আজমলের নামে রয়েছে দুটি অ্যাপার্টমেন্ট—একটি মিরপুরে, আরেকটি জোয়ার সাহারায়। আজমল এখন পলাতক। ধানমণ্ডি ও খিলগাঁওয়ে রয়েছে তাজুলের বিশেষ সহকারীর নামে দুটি ফ্ল্যাট। এমনকি এক ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে তিনি ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার নামেও কিনিয়েছেন বাড়ি, যেগুলোর মালিকানা হেবা দলিলের মাধ্যমে নিয়েছেন নিজের নামে।
এই ফ্ল্যাট ও দোকানগুলো থেকে যে বিপুল ভাড়া আসে, তা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হয় কলকাতায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিমাসে কোটি টাকার ওপরে অর্থ পাচার হচ্ছে এইভাবে।
তাজুল ইসলামের আদি জেলা কুমিল্লাতেও রয়েছে একটি বেনামি বহুতল মার্কেট। এখান থেকেও মাসে অন্তত ১০ লাখ টাকা ভাড়া ওঠে। ওই অর্থও একইভাবে বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তদন্তে সীমাবদ্ধতা
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বলছে, তাজুল ইসলামের নামে যেসব সম্পদ পাওয়া গেছে, কেবল সেগুলোই জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। বেনামি সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করতে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে তাঁর বিপুল সম্পদের বেশির ভাগই রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
একজন দুদক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “আমরা যা জব্দ করেছি, তা মূল সম্পদের একমাত্র অংশমাত্র। অন্যান্যগুলো সম্পর্কে আমাদের হাতে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলেও সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারছি না।”
‘রাজকীয়’ জীবন কলকাতায়ও
বাংলাদেশে যেভাবে রাজকীয়ভাবে চলতেন, কলকাতায়ও ঠিক তেমনভাবেই জীবনযাপন করছেন তাজুল। গোপন সূত্রগুলো বলছে, নিউ টাউনের সেই সুরম্য ফ্ল্যাটে পরিবারসহ থাকলেও তাঁকে ভাড়া দিতে হয় না। ধারণা করা হচ্ছে, চোরাচালান চক্রই তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে।
তার সঙ্গে থাকা কর্মচারী, দেহরক্ষী, গাড়ি, অফিস—সবই আছে আগের মতো। এমনকি শোনা যাচ্ছে, সম্প্রতি তিনি কলকাতায় একটি নতুন অফিসও নিয়েছেন। পরিকল্পনা করছেন, শিগগিরই দুবাই পাড়ি দেবেন।
তথ্য বলছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পরই তিনি দেশ ছেড়েছেন। তার আগে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠদের বিদেশে পাঠিয়ে দেন। স্ত্রী ফৌজিয়া ইসলামও গত বছরের আগস্টে কলকাতায় এসে কিছুদিন থাকার পর যান দুবাইয়ে। পরে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন।
রাজনীতিকে বানিয়েছিলেন ব্যবসা
দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার অংশীদার থেকে রাজনীতিকে ব্যবসার মোড়কে ঢেকে ফেলেন মো. তাজুল ইসলাম। সরকারি পদে থেকে গড়ে তোলেন বিশাল অবৈধ সম্পদের সাম্রাজ্য। যেটির একটি ক্ষুদ্র অংশই এখন পর্যন্ত নজরে এসেছে এবং জব্দ করা হয়েছে।
এখনো তাঁর অধিকাংশ সম্পদ রয়েছে আড়ালে। তাঁর পুরনো পথ—চোরাচালানকে পুঁজি করেই আবার নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন তিনি। আর আইনগত ফাঁকফোকরে থেকেই বিদেশে রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

