ভোজ্যতেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপুল মুনাফা করার অভিযোগ উঠেছে দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী টিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের তদন্ত শেষে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩২ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত মুনাফার পরিমাণ ছিল ৫০০ কোটিরও বেশি টাকা।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে ভোজ্যতেলের চাহিদা বাড়ার সময় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়নি। বরং সীমিত সরবরাহের মাধ্যমে সংকটের পরিবেশ তৈরি করা হয়, যার ফলে বাজারে দাম বাড়তে থাকে। ওই সময় ভোক্তাদের মধ্যে তেল সংকটের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ায় চাহিদা আরও বেড়ে যায় এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ তীব্র হয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২২ সালে কয়েকটি শীর্ষ তেল আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান সরবরাহ ঘাটতির যুক্তি তুলে ধরে মূল্য সমন্বয়ের দাবি জানায়। যদিও তাদের গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিবেশকদের কাছে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় নিয়েছিল। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ বিলম্বিত করা হয়। ফলে বাজারে পণ্যের প্রবাহ কমে যায় এবং সংকটের ধারণা তৈরি হয়।
প্রতিযোগিতা কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এমন আচরণ বাজার প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কমিশন মনে করে, এটি বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সয়াবিন তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও বাজারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোক্তাদের বেশি দামেই তেল কিনতে হয়েছে। তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ওই সময় প্রতিষ্ঠানটি তাদের উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করেনি। উৎপাদন কমিয়ে আনা এবং পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাজারে সীমিত সরবরাহের অভিযোগও উঠে এসেছে।
এরপর রমজান মাস ঘিরে চাহিদা বাড়ার সময় বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে মে মাসের মধ্যে সয়াবিন তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। একই সময়ে বাজারে ভোজ্যতেলের দামও বড় ধরনের বৃদ্ধি পায়।
অভিযোগ রয়েছে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার তেল বিক্রি করে এবং অতিরিক্ত ৫০০ কোটির বেশি মুনাফা অর্জন করে। সমালোচকদের মতে, এই মুনাফার মূল ভার বহন করতে হয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের, যারা বাড়তি দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাধ্য হয়েছেন।
ঘটনার তদন্ত শেষে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। কমিশন লিখিত ব্যাখ্যা গ্রহণ, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং শুনানি শেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে বাজারে প্রতিযোগিতা ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে জরিমানার পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কমিশনের আইন অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভারের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য আফরোজা বিলকিস জানিয়েছেন, এটি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কমিশনের প্রথম মামলা হওয়ায় সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়নি। সংশোধনের সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে আলোচনা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিযোগিতা কমিশনের রায়ে অভিযোগের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হতে পারে।
ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাজার কারসাজির অভিযোগে জরিমানা হলেও শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে আদায় হয় না। ফলে শাস্তির ভয় কম থাকায় অসাধু ব্যবসায়িক চর্চা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। তাদের মতে, বিদ্যমান আইনে আরও কার্যকর ব্যবস্থা এবং জরিমানা বাস্তবায়নের কঠোর বিধান প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোজ্যতেল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্য। এ বাজারে কৃত্রিম সংকট বা সমন্বিত কারসাজি শুধু মূল্যস্ফীতি বাড়ায় না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। তাই বাজারে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি হয়ে উঠেছে।

