রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে যথাযথ অনুমোদনের কাগজপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়। সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অবকাঠামো চুক্তি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ায় আবাসন ভাড়ায় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্প শুরু হয়। প্রথমে দুই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা থাকলেও ২০১৫ সালে তা বাড়িয়ে করা হয় দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তের কোনো নথি পাওয়া যায়নি। এতে প্রকল্পের খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় সোয়া লাখ কোটি টাকা (১৩.১৯ বিলিয়ন ডলার)।
অতিরিক্ত মহাহিসাব নিরীক্ষক কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনটি গত মে মাসে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোম্পানির (এনপিসিবিএল) কাছে পাঠানো হয়। এতে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব খতিয়ে দেখা হয়েছে।
এরই মধ্যে রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে রাশিয়া। রোসাটম এটি নির্মাণ করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল এ বছর, তবে তা এক বছর পিছিয়েছে। ইতিমধ্যে কাজের ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “পারমাণবিক প্রকল্প একটি দেশের মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু রূপপুর প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত হওয়া উচিত।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রূপপুর প্রকল্প শুরু থেকেই বিতর্কিত। প্রতিযোগিতা ছাড়াই এত বড় প্রকল্প রাশিয়ার হাতে দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির সূচকে রাশিয়ার অবস্থানও খারাপ। রোসাটম নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। শুধু পতিত সরকার নয়, জড়িত আমলাদেরও দায় নিতে হবে।”
বাড়তি খরচের নথি মিলল না
২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের নেতৃত্বে এক বৈঠকে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে খরচ নির্ধারণে সমঝোতা দল গঠন করা হয়। কিন্তু ২০১৫ সালে কোনো সমঝোতা ছাড়াই রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি হয়। এতে দুই ইউনিট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য আরও চারটি চুক্তিতে ব্যয় হয় ০.৫৪৫৯ বিলিয়ন ডলার। মোট খরচ দাঁড়ায় ১৩.১৯ বিলিয়ন ডলার। নিরীক্ষকরা বলেন, ব্যয় বৃদ্ধির কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা মেলেনি।
চুক্তির সময়কার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান এবং অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা সাড়া দেননি। তৎকালীন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে হতো।
হোটেল খরচে অনিয়ম
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ার তিনটি শহরে যন্ত্রপাতি পরীক্ষার জন্য কোয়ালিটি ইন্সপেকশন ইউনিট ভাড়া করা হলেও একই সময়ে হোটেল খরচও দেখানো হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শুধু হোটেল খাতে খরচ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৭৯ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ টাকা। নিরীক্ষকরা এটিকে ‘অযৌক্তিক’ বলেছেন।
এ ছাড়া প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাছান ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাশিয়ায় আবাসন ভাড়ার নামে ৭৭ লাখ ৩ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী এসব পরিশোধের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ দূতাবাসের। নগদ উত্তোলনের সঠিক হিসাবও পাওয়া যায়নি।
আইএইএর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সর্বশেষ ভিভিআর-১২০০ প্রযুক্তিতে নির্মিত রূপপুর কেন্দ্রের কিলোওয়াটপ্রতি খরচ পড়ছে ৫ হাজার ৮৯০ ডলার। অথচ রাশিয়াতেই একই প্রযুক্তিতে খরচ ৪ হাজার ৭৫ ডলার। তুরস্কের আক্কুইউ পারমাণবিক কেন্দ্রে খরচ আরও কম, প্রতি কিলোওয়াট ৩ হাজার ২০০ ডলার।

