দেশে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে আইন সংশোধন করে তদন্তের সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, অধিকাংশ মামলাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে অনেক ভুক্তভোগী পরিবারকে মাসের পর মাস, কখনো কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার জন্য।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ করে আদালত দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ঘটনাটি দ্রুত বিচার নিশ্চিত হওয়ার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য মামলার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। অনেক মামলার তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই আটকে রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৪৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় দায়ের হয়েছে ৪১৩টি মামলা। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ৪১৩ মামলার মধ্যে মাত্র ৬৫টির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ১০টি মামলায় পর্যাপ্ত প্রমাণ বা সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকি অধিকাংশ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, যেসব ধর্ষণ বা ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়, সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয় কিংবা মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরব হয়, সেসব মামলায় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত এগোয়। বিপরীতে আলোচনার বাইরে থাকা অনেক ঘটনায় তদন্তের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো হতাশ হয়ে পড়ে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পাহাড়ি অঞ্চলের একটি আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যা মামলার উদাহরণও একই প্রশ্ন সামনে এনেছে। ঘটনার পর স্থানীয় জনগণ মানববন্ধন করেছেন, বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি উঠেছে এবং বিশিষ্ট নাগরিকরাও দ্রুত বিচারের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তবু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনো অভিযুক্তদের শনাক্ত করা যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় শুধু ধর্ষণের অভিযোগেই ১৭৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নারী ধর্ষণের অভিযোগে ১১৫টি এবং শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ৬৩টি মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু এসব মামলার বড় অংশ এখনো তদন্তাধীন।
তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধর্ষণ মামলার তদন্তে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় মেডিক্যাল ও ফরেনসিক প্রতিবেদন সংগ্রহ। ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট, ডিএনএ বিশ্লেষণ, আলামত পরীক্ষা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিবেদন পেতে কয়েক মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়।
রাজধানীর একটি শিশু ধর্ষণ মামলার তদন্তেও একই ধরনের জটিলতা দেখা গেছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হলেও ডিএনএ ও মেডিক্যাল রিপোর্ট না পাওয়ায় মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিচার কার্যক্রমও শুরু করা যাচ্ছে না।
আইন অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সর্বশেষ সংশোধনের পর আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিচারক প্রয়োজন মনে করলে কিছু ক্ষেত্রে সময় বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক না রেখে আদালতকে প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সময়সীমা নির্ধারণ করলেই হবে না; সেই সময়সীমা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। বর্তমানে অনেক তদন্ত কর্মকর্তা একসঙ্গে বহু মামলার দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলায় প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ও আইন বিশ্লেষকদের মতে, ধর্ষণ মামলার জন্য বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তারা মনে করেন, তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে তদন্ত দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, অনেক সময় ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার নিয়মিত আইনি সহায়তা পায় না। ফলে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তারা অন্ধকারে থাকে। এতে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে হতাশা বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার গতি কোনোভাবেই গণমাধ্যমের আলোচনার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি মামলাই সমান গুরুত্বে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ বিচার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা।
তাদের মতে, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, ফরেনসিক প্রতিবেদন দ্রুত সরবরাহ, বিশেষায়িত তদন্ত টিম গঠন এবং মামলার অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। অন্যথায় দ্রুত বিচারের জন্য আইন সংশোধন হলেও বাস্তবে বিচার পেতে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা অব্যাহত থাকবে।

