ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর কার্যক্রম বৃহস্পতিবার ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্কে নতুন করে যুক্ত হওয়া অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে ধাপে ধাপে বন্ধ করার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। এনইআইআর চালুর ফলে এখন ঘরে বসেই জানা যাচ্ছে, একটি জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে কতটি মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে।
তবে এই সুবিধার পাশাপাশি সামনে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তির অজান্তেই তার এনআইডি ব্যবহার করে একাধিক মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যতে আইনি ঝুঁকি ও বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে।
এমনই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মাসুম বিল্লাহ ভূঁইয়া। পেশায় তিনি একজন ফ্রিল্যান্সার। তার এনআইডি ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত ৫৩টি মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে বলে তিনি জানতে পারেন। বিষয়টি তার জন্য ছিল সম্পূর্ণ অজানা। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ডিসেম্বর ২০২৫ মাসেই তার এনআইডি দিয়ে ৪২টি মোবাইল সেট রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। অথচ তিনি নিজে দেশে থেকে সর্বশেষ হ্যান্ডসেট কিনেছেন অন্তত চার বছর আগে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার নিজের ব্যবহৃত হ্যান্ডসেটটি তার এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিতই নয়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আঙ্গুরা বেগম। তিনি একটি বেসরকারি এনজিওতে কর্মরত। তিনি বলেন, তার এনআইডি দিয়ে ২১টি মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশন করা রয়েছে। তিনি সর্বশেষ ফোন কিনেছিলেন ২০২১ সালে। এনইআইআর সিস্টেমে যাচাই করে হঠাৎ করেই তিনি নিজের নামে এতগুলো ফোন নিবন্ধিত থাকার বিষয়টি জানতে পারেন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও টেলিকম খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনিয়ম অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের মতে, এনআইডি তথ্য ফাঁস, অসাধু রিটেইলার এবং আমদানিকারকদের মাধ্যমে অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে হ্যান্ডসেট রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে। এসব হ্যান্ডসেট যদি অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে প্রাথমিকভাবে এনআইডি মালিককেই জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হতে পারে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের উপ-পরিচালক মো. জাকির হোসেন খাঁন বলেন, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এ জন্য একটি বড় ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। সেই ডাটাবেজের ভেতরে ধীরে ধীরে কাজ করে অবৈধ হ্যান্ডসেটগুলো শনাক্ত করা হবে এবং সেগুলো আলাদা করার চেষ্টা চলবে। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত জটিল কাজ এবং একদিনে শেষ করা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে যেন নতুন করে কোনো অবৈধ সেট নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে না পারে, সেটিই প্রধান লক্ষ্য।
তিনি আরও জানান, ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত সব হ্যান্ডসেট ডাটাবেজে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সেখানে বৈধ সেটের পাশাপাশি কিছু অবৈধ সেটও রয়েছে। আগে থেকেই নেটওয়ার্কে থাকা কিছু সেট সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সিস্টেমে নিবন্ধিত হওয়ায় সেগুলো ২০২৫ সালের এন্ট্রি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তবে এতে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
বিটিআরসির এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। একটি আইএমইআই নম্বর যদি একাধিক সেটে ব্যবহৃত হয়, তাহলে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ধাপে ধাপে ডাটা সাজিয়ে এমন একটি অবস্থায় নেওয়া হচ্ছে, যাতে মূল অপরাধীকে চিহ্নিত করা যায় এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা নিরাপদ থাকেন। সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এনআইডিতে একাধিক সেট নিবন্ধিত দেখা গেলে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, যদি কোনো ব্যবহারকারীর নিজের ব্যবহৃত সেটটির আইএমইআই নম্বর সঠিকভাবে মিলে যায়, তাহলে তালিকায় থাকা অন্য সেটগুলো ডিঅ্যাক্টিভেট করলে সাধারণত কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে হেল্পলাইনে যোগাযোগ করলে সহায়তা পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো সিম যদি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ফোনে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও সেটগুলো তালিকায় যুক্ত হতে পারে। তাই যাচাইয়ের সময় এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

