২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটি আদানি পাওয়ার লিমিটেড (এপিএল)-এর সঙ্গে কয়লার মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে। কমিটি জানিয়েছে, যদি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির শর্ত পুনর্বিবেচনায় রাজি না হয়, তখন চুক্তি বাতিলের পথও খোলা রয়েছে।
তবে কমিটি এখনই কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেনি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশগুলো মূলত পূর্ববর্তী বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনা ও সমাধানের কাঠামো হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, পর্যালোচনায় তারা সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও আদানি পাওয়ারের মধ্যে “দুর্নীতিমূলক যোগসাজশের স্পষ্ট ইঙ্গিত” পেয়েছেন। এক কমিটি সদস্য বলেন, “পর্যালোচনার সময় সরকারি কর্মকর্তাদের নামে থাকা বিদেশি ব্যাংকে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব লেনদেন ২০১৭ সাল থেকে শুরু, যা চুক্তি আলোচনা ও স্বাক্ষরের সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।”
প্রতিবেদনের গভীরতা ও পরিধি বোঝার জন্য কমিটির একাধিক সদস্য, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অধিকাংশ সন্দেহজনক লেনদেন বিদেশি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে হয়েছে। অল্প কিছু লেনদেন দেশেও সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, “চুক্তি থেকে যারা সুবিধা পেয়েছেন, তারাই ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের আগে দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।” আদানি গ্রুপ বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের কাছে অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ আছে কি না—এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করেননি।
পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে আদানি পাওয়ার এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে চুক্তির মৌলিক দুর্বলতার কারণে এটি দেশের জন্য আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী একজন কর্মকর্তা বলেন, “ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কয়লার সূচকের গড়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত মূল্য ভারতের অন্যান্য সরবরাহকারীর তুলনায় কৃত্রিমভাবে জ্বালানি ব্যয় বাড়াচ্ছে।”
অন্য এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কিছু প্রমাণ পরিস্থিতিগত হলেও চুক্তির কাঠামো ইঙ্গিত দেয়, যে প্রক্রিয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশি হিসাবের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা হয়েছে। কমিটির এক সদস্য বলেন, “আমাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে, যারা চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করেছেন এবং যারা এর সুবিধাভোগী, সবকিছুই চিহ্নিত করা হয়েছে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সদস্য আরও অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা—যিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন—চুক্তিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি সাবেক দুই বিদ্যুৎ সচিব আবুল কালাম আজাদ ও আহমদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে “সংঘবদ্ধ দুর্নীতিতে” জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন।
চুক্তি বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার মতো শক্ত প্রমাণ আছে কি না—এমন প্রশ্নে কমিটির চেয়ারম্যান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আগামীকাল (২৫ জানুয়ারি) সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যম সব উত্তর পাবে।”
কমিটি গঠন ও সদস্যরা:
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১০ সালের “বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন” অনুযায়ী স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী। অন্যান্য সদস্যরা হলেন—বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশফাক, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ মোশতাক হোসেন খান। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক কমিটিতে যুক্ত হন। এতে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়জন।
বিদ্যুৎ খাতে সংঘবদ্ধ দুর্নীতি:
প্রাথমিক মূল্যায়নে কমিটি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে সংঘবদ্ধ দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এর ফলে বিদ্যুতের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। কমিটির সদস্য মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির সঙ্গে চুক্তি সংক্রান্ত প্রমাণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উভয় ক্ষেত্রেই আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি হতে পারে।
কমিটির চেয়ারম্যান, বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, চুক্তি শেষ পর্যন্ত বাতিল করা যাবে কি না তা এখনও অনিশ্চিত। তবে তিনি বলেন, এতে “ব্যাপক দুর্নীতি” পাওয়া গেছে।
সূত্রগুলো টিবিএসকে জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক সাবেক সচিব, বিপিডিবির চেয়ারম্যান এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি ও পাওয়ার সেলের কর্মকর্তারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে কাজ করেছেন।
দুদক আদানি চুক্তির নথি সংগ্রহ করেছে:
হাইকোর্টে করা একটি রিট আবেদনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আদানি চুক্তি সংক্রান্ত নথি ও তথ্য বিপিডিবির কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিডিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনাই নিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন। তাদের কেউ কেউ আদানি গ্রুপ থেকে সুবিধা পেয়েও থাকতে পারেন।”
কয়লার মূল্য নির্ধারণে অচলাবস্থা:
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর বিপিডিবি কয়লার মূল্য নির্ধারণের ফর্মুলা পুনর্বিবেচনার জন্য আদানি পাওয়ারের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছে। সর্বশেষ বৈঠকটি ২৩ জুন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়। এতে আদানির সিইও শেরসিংহ বি খেয়ালিয়া এবং বিপিডিবির কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স সচিব আ. ন. ম. ওবায়দুল্লাহ অংশ নেন।
কর্মকর্তারা জানান, আদানি চুক্তি পুনরায় আলোচনায় আনতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একজন মধ্যস্থতাকারী মনোনয়ন দিয়েছে এবং বিপিডিবিকেও একই কাজ করতে বলেছে। এরপর বিষয়টি আন্তর্জাতিক সালিশের জন্য সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
সে সময় বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, “আদানির পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ ইঙ্গিত দেয় যে তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাইছে না, বরং আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।” বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, “জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আইনি লড়াইয়ের জন্য আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”
আদানির সঙ্গে চুক্তি এক নজরে:
২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় বিপিডিবির সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে আদানি চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায়, ২০১৭ সালের নভেম্বরে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষরিত হয়।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ইউনিট ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে উৎপাদন শুরু করে। কয়লার উচ্চমূল্য নিয়ে সমালোচনার মুখে আদানি পাওয়ার বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছিল, তাদের বিদ্যুতের দাম রামপাল বা অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় বেশি হবে না।
তবে বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম অন্য ভারতীয় উৎসের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি ব্যয়বহুল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা, যেখানে অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুতের দাম ছিল প্রতি ইউনিট ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে।

