সুন্দরবনের দক্ষিণাংশে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত দুবলার চর। বাগেরহাটের শরণখোলার এই দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। পর্যটকদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণ। কিন্তু শুঁটকি মাছের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে ‘সাহেব সিন্ডিকেট’। তাদের ছাড়া কেউ শুঁটকি বিক্রি করতে পারে না। এভাবে পর্যটক ও সাধারণ জেলেদের পকেট কেটে সিন্ডিকেট লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দ্বীপটি ঘুরে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম দেখা গেছে। জেলেদের অভিযোগ ও ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী প্রতি কেজি লইট্টা ও ছুরি শুঁটকিতে ২-৪শ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে চলতি মৌসুমে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দুবলা নিউমার্কেট ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহম্মদ বলেন, “শুঁটকি বিক্রিতে সিন্ডিকেট ছাড়া কেউ কিছু করতে পারে না। পর্যটকদের পকেট থেকে লাখ লাখ টাকা চলে যাচ্ছে।”
পর্যটক ও স্থানীয় জেলেরা অভিযোগ করছেন, বনবিভাগের সহযোগিতায় ‘সাহেব’ নামে পরিচিত প্রভাবশালী কিছু মধ্যস্বত্বভোগী এ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মাধ্যমে তারা পর্যটকদের কাছে শুঁটকি বিক্রি করছে অনেক বেশি দামে। এতে সাধারণ জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পর্যটকরাও ঠকছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি সুন্দরবনের হাজার কোটি টাকার পর্যটন শিল্পের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শুঁটকি উৎপাদনের ক্ষেত্রে দুবলার চর দেশের অন্যতম বড় কেন্দ্র। নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে এখানে শুঁটকি উৎপাদন ও বেচাকেনা বেশি হয়। দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে হাজারো জেলে অস্থায়ী বসতি গড়ে শুঁটকি তৈরি করেন। লইট্টা, ছুরি, ফাইস্যা, পোয়া, টেংরা, তপসি, চাপিলা, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ সামুদ্রিক মাছ শুকিয়ে শুঁটকি বানানো হয়। বাঁশের মাচায় খোলা রোদে মাছ শুকিয়ে এগুলো পাইকারি বাজারে পাঠানো হয়।
গত ১৩ জানুয়ারি সরেজমিনে দেখা যায়, জেলেপল্লিতে শত শত অস্থায়ী ঘর এবং মাছ শুকানোর মাচা। মাছের সরবরাহ কম থাকায় মাচাগুলো খালি। তবে সৈকত সংলগ্ন চারটি অস্থায়ী দোকানে শুঁটকি বিক্রি চলছিল। এখানে আগে থেকেই আটটি ট্রান্সপোর্ট ছিল। এবছর বনবিভাগ ঝামেলা এড়াতে চারটি ট্রান্সপোর্টকে শুঁটকি বিক্রির দায়িত্ব দিয়েছে। প্রতি কেজি শুঁটকিতে ১১.৫ টাকা রাজস্ব আসে বলে জানান দুবলার জেলেপল্লি টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায়।
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর পর্যটকরা ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শেষ মুহূর্তে দোকানগুলোতে ভিড় করেন তারা। দোকানি যেভাবে দাম চান, ততটাই দিতে বাধ্য হচ্ছেন পর্যটকরা। অনেকেই শুঁটকির সঠিক বাজারমূল্য জানেন না। যারা জানেন তাদেরও দাম শুনে হতবাক হতে হয়। খুলনা বা চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে যে দামে শুঁটকি বিক্রি হয়, একই শুঁটকি দুবলার চরে চারটি দোকানে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
দুবলার চরে জেলেরা হতাশ, ঠকছে পর্যটকও:
দুবলার জেলেপল্লির বেশ কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয়। তারা অভিযোগ করছেন, উৎপাদন পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য পান না। কিন্তু সিন্ডিকেট করে পর্যটকদের কাছে একই শুঁটকি অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে। পর্যটকদের থেকে হাতিয়ে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা ভাগাভাগি করা হয় সিন্ডিকেট সদস্য ও বনবিভাগের মধ্যে।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বাসিন্দা প্রশান্ত বিশ্বাস শুঁটকি মৌসুমে পাঁচ মাসের জন্য দুবলার চরে যান। বনবিভাগের অনুমোদিত লোকদের কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন। আগের বছরগুলোতে শুঁটকি পর্যটকদের কাছে সরাসরি বিক্রি করা যেত। এতে জেলেরা কিছুটা লাভবান হতেন। পর্যটকরাও কম দামে শুঁটকি কিনতে পারতেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই সুযোগ নেই।
প্রশান্ত বিশ্বাস বলেন, “আমরা এখন পর্যটকদের কাছে সরাসরি শুঁটকি বিক্রি করতে পারি না। এবছর শুঁটকি বিক্রির দায়িত্ব সাহেবদের দোকানে। দুবলায় চার-পাঁচজন সাহেব আছেন—কামাল সাহেব, পিন্টু সাহেব, হক সাহেব। তাদের দোকান ছাড়া পর্যটকরা শুঁটকি কিনতে পারবে না।”
বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, “তারা অতিরিক্ত দাম নিতে পারলেও রাজস্বের বাইরে আমরা কিছু দেখি না। দোকানগুলো (ট্রান্সপোর্ট মালিক) আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ থাকায় ভবিষ্যতে আরও কিছু দোকান বসানোর কথাও ভাবছি।” তিনি আরও বলেন, “তৈরি শুঁটকি সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। ছোট সাইজের ছুরি শুঁটকি ৪০০-৬০০ টাকায়, মাঝারি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু সাহেবদের দোকানগুলোতে দাম অনেক বেশি। এতে সাধারণ জেলেরা লাভবান হচ্ছেন না।”

জেলে মাধব দাশ বলেন, “দুবলার চর থেকে শুধু পর্যটকরা শুঁটকি কেনেন না। চট্টগ্রাম, সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন জেলায় পাইকারি পাঠানো হয়। চাহিদার ওপর দাম বাড়ে কমে। মাছ কম ধরা পড়লে দাম বেশি হয়, বেশি ধরা পড়লে দাম কম। এবার জেলেদের চাতাল থেকে সরাসরি পর্যটকদের কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ। নির্ধারিত দোকান থেকে শুঁটকি কিনতে হবে।”
জেলে মিলন বিশ্বাস জানান, “চারটি দোকান আমাদের কাছ থেকে মণ ২০ হাজার টাকায় শুঁটকি কিনে ৩৫-৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। বড় ছুরি মাছ ৭০০-৯০০, মাঝারি ৬০০-৭০০ টাকা। এখন সিন্ডিকেট হয়ে গেছে। ছোট-মাঝারি মাছ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায়।”
সাতক্ষীরা থেকে আসা পিযুষ বিশ্বাস জানান, “আমরা ১২ লাখ টাকা খরচ করে এখানে পৌঁছেছি। তিনদিন পরে জেনেছি, সিন্ডিকেট হয়েছে। সাহেবরা স্পেশালভাবে দোকান বসিয়ে বিক্রি করছেন। যারা গত বছর পর্যটকদের কাছে ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি করেছিল, এবছর একই মাছ এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পর্যটকরা মন খারাপ করে ফিরছে।” পিযুষ একটি ছোট গাগড়া টেংরা শুঁটকি দেখিয়ে বলেন, “এই মাছ কেজি একশ টাকায় কিনে দোকানগুলো ৪০০ টাকায় বিক্রি করছে। আমরা আগে দেড়শ থেকে দুইশ টাকায় বিক্রি করতাম। এখন সিন্ডিকেটের কারণে দাম চারগুণ।”
শীত মৌসুমে ২ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন সুন্দরবন:
শীত মৌসুমে সুন্দরবনে ভ্রমণকারীদের সেবা দেয় ৮০টির মতো জাহাজ। ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) তথ্যমতে, নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত এই জাহাজগুলো ট্যুর পরিচালনা করে। বনবিভাগের নিয়ম অনুযায়ী একটি জাহাজ এক ট্রিপে ৭৫ জনের বেশি পর্যটক নিতে পারে না। চাহিদা অনুযায়ী সপ্তাহে দুটি ট্যুর হয়। প্রতি মৌসুমে দুই লাখের মতো পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে প্রায় একলাখ পর্যটক দুবলার চরে যান।
সুন্দরবনে বড় ট্যুর পরিচালনাকারী হলিডেজ শিপিং লাইনস। তাদের দুটি উন্নত ক্রুজ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবুল ফয়সাল মো. সায়েম বাবু টোয়াসের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
দুবলার চরে শুঁটকি সিন্ডিকেট বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সুন্দরবনে ৭০টি জাহাজ রয়েছে। প্রতি সিজনে কোনো কোনো জাহাজ ৪০টি ট্যুর করে। প্রতি ট্যুরে প্রায় ৭০ জন পর্যটক থাকে। সুন্দরবনে গেলে পর্যটকেরা দুবলার চরে যান।” তিনি আরও বলেন, “দুবলায় আগে লইট্টা মাছ ৩০০ টাকায় বিক্রি হতো। এবার তা ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরা অতিরিক্ত দামে শুঁটকি কিনে প্রতারিত হচ্ছে। এখন দেশে নির্বাচনের হাওয়া চলছে। নির্বাচনের পর আমরা বনবিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জানাবো।”
চার দোকান ছাড়া বিক্রি করা যায় না শুঁটকি:
চলতি মৌসুমে দুবলার চরে চারটি নির্দিষ্ট দোকান থেকে পর্যটকেরা শুঁটকি কিনতে পারেন। সেগুলো হলো—সাগর ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স সুন্দরবন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, সুন্দরবন সাউথ জোন ট্রান্সপোর্ট ও মেসার্স নিউ রামপাল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি। সাগর ট্রান্সপোর্টের একটি রসিদে লেখা রয়েছে, “দুবলার চরে রসিদ ব্যতীত শুঁটকি ক্রয় আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ।”
শুঁটকিতে মাত্র সাড়ে ১১ টাকার রাজস্বে দামের অস্থিরতা:
দুবলা নিউ মার্কেট ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহম্মদ বলেন, তার নিজস্ব ছয়টি পরিবহন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলো হলো—সাগর ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স সুন্দরবন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি ও বিলাস ট্রান্সপোর্ট। রসিদে লেখা রয়েছে ‘প্রোপ্রাইটর বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহম্মদ’। দোকানগুলোতে কোরাল ও রূপচাঁদা শুঁটকি প্রতি কেজি ৪ হাজার টাকা, লইট্টা ৮০০–১,১০০ টাকা, ছোট ছুরি শুঁটকি ১,০০০–১,৪০০ টাকা, বড় চিংড়ি ১,৩০০ টাকা, ছোট চিংড়ি পোনা ৩০০–৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে পর্যটকরা মূলত লইট্টা ও ছুরি শুঁটকি কেনেন।
কামাল আহম্মদ বলেন, “দুবলায় প্রতি মৌসুমে এক লাখের মতো পর্যটক বেড়াতে আসেন। কেউ এক কেজি, কেউ পাঁচ কেজি শুঁটকি কিনে নেন। বনবিভাগের হিসাব অনুযায়ী বছরে ৪–৫ লাখ কেজি শুঁটকি পর্যটকেরা কিনে নেন। সরকারি নিয়মে প্রতি কেজি শুঁটকিতে ১১.৫ টাকা রাজস্ব থাকে। এবছর রাজস্ব আদায়ের জন্য বনবিভাগ আমাদের চারটি ট্রান্সপোর্টকে শুঁটকি বিক্রির অনুমতি দিয়েছে।”
জেলেদের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “দুবলায় বনবিভাগ অনুমোদিত ৫–৬শ অস্থায়ী ঘর রয়েছে। নৌকা আছে ১,০০০–১,২০০। দ্বীপে যাওয়া ৯০ শতাংশ জেলের কোনো মূলধন নেই। ব্যবসায়ী, পাইকার ও সমিতি থেকে জেলেরা অগ্রিম টাকা পান। আগের বছরগুলোতে পর্যটকদের কাছে শুঁটকি বিক্রি অরাজক ছিল। বেশি দাম নেওয়া হতো। তাই এবার জেলেদের সরাসরি বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অন্যান্য খাতে বনবিভাগকে আলাদা টাকা দিতে হয়। কিন্তু পর্যটকের কাছে বিক্রি করা শুঁটকিতে অতিরিক্ত কোনো সুবিধা নেওয়া হয় না। প্রতি কেজি শুঁটকিতে খরচ বাদে ১০০ টাকা লাভ থাকলে দোকানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
বনবিভাগের দুবলা জেলেপল্লি টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায় বলেন, “আগে থেকেই আটটি ট্রান্সপোর্ট ছিল। এবছর পর্যটকদের মধ্যে শুঁটকি বিক্রি নিয়ন্ত্রণে আনতে চারটি ট্রান্সপোর্টকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি কেজি শুঁটকিতে সাড়ে ১১ টাকা রাজস্ব আসে। পর্যটকরা শুঁটকি কিনলে রসিদ দেওয়া হয়। বনবিভাগ রসিদ বই যাচাই করে রাজস্ব আদায় করে।”
বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “শুঁটকি বিক্রির পারমিট অনেকের আগে থেকেই আছে। এবার শুধু খুচরা বিক্রির জন্য দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যটকের কাছে বিক্রি হওয়া শুঁটকির রাজস্ব বনবিভাগের দফতরে আসে। এর বাইরে কোনো সুবিধা নেওয়া হয় না।”
তিনি আরো যোগ করেন, “দোকানগুলো বাজারের চেয়ে বেশি দাম নিতে পারলেও রাজস্বের বাইরে আমরা কিছু দেখি না। যে দোকানগুলো বসেছে, তারা আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ থাকায় ভবিষ্যতে আরও কিছু দোকান বসানোর কথাও ভাবছি।

