দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত ও পলাতক পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদ ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ায় তার অতীত কর্মকাণ্ড আবারও আলোচনায় এসেছে। একসময় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এই কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হলে কোন কোন মামলায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে—সে প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিশেষ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া, শাপলা চত্বরের ঘটনা, সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অসংখ্য গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নেপথ্যের তথ্য সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তাকে ঠিক কবে দেশে আনা হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মোট ২৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি বৈষম্যবিরোধী হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা, দুর্নীতি দমন কমিশনের ৬টি মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ৩টি মামলা অন্তর্ভুক্ত। ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে ৩টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছে। বৈষম্যবিরোধী মামলাগুলোর বেশির ভাগই রাজধানী ঢাকায় দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার কোনো তদন্তই এখনো শেষ হয়নি। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জেলায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। জুলাইয়ের এসব মামলার অধিকাংশের প্রধান আসামি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম রয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দুদকের মামলার ভিত্তিতেই বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ওই নোটিসের ভিত্তিতেই দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
তিনি আরও জানান, দেশে ফিরিয়ে আনার পর প্রথমে দুদকের মামলায় তাকে আদালতে হাজির করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হবে। সূত্র জানায়, বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন মোট ছয়টি মামলা করেছে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো এখন বিচার ও তদন্তের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে একটি মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ আরও পাঁচটি মামলার তদন্ত চলছে।
দুদকের করা চারটি মামলায় বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মোট ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগের মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
অন্যদিকে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রসঙ্গও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে কথিত গণহত্যার ছক বাস্তবায়নে বেনজীর আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিল করা হয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছে।
এছাড়া র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সংক্রান্ত আরেকটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। ওই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জন আসামির মধ্যে বেনজীর আহমেদও রয়েছেন। তিনি বর্তমানে এ মামলায় পলাতক হিসেবে চিহ্নিত।
দেশে ও বিদেশে সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য:
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদ শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না—তার বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করা হয়েছে, যা তিনি বিভিন্ন ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যৌথ মূলধনি কোম্পানিতে বিনিয়োগ ও স্থানান্তরের মাধ্যমে আড়াল করার চেষ্টা করেন।
অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ সদর এলাকায় ৬২১ একর জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, ওই এলাকার কয়েকটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারকে ভয় দেখিয়ে ও চাপ প্রয়োগ করে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। নির্মাণকাজে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে গাজীপুরের কালীগঞ্জেও হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জমি কম দামে কিনে নেওয়া এবং ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সেখানে ‘ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ নামে একটি রিসোর্টে তার মালিকানার তথ্য পাওয়া যায়।
অভিযোগ আছে, ২০২৩ সালের ৫ মার্চ একদিনেই ঢাকার গুলশানের র্যাংকন আইকন টাওয়ারে চারটি ফ্ল্যাট কেনেন বেনজীর আহমেদ। বিদেশেও তার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। স্ত্রী জিসান মির্জার নামে দুবাইয়ে ১ কোটি ৪ লাখ ৭৯ হাজার দিরহাম মূল্যের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনা হয়। পাশাপাশি সেখানে দুটি ব্যাংক হিসাবে ১ লাখ ৬২ হাজার দিরহাম জমা থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
শুধু দুবাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যেও তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ এবং বিনিয়োগ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। দেশের ভেতরে সেন্ট মার্টিনে ১ দশমিক ৭৫ একর এবং কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের কাছে স্ত্রী ও কন্যাদের নামে ৭২ শতক জমি কেনার তথ্যও সামনে এসেছে।
এছাড়া বেনজীর আহমেদ পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে পরিবারের সদস্যদের নামে মোট ৪৬৬ বিঘা জমি কেনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে ১৯টি প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিবারটি ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে তোলে বলে দাবি করা হচ্ছে। শুধু স্ত্রীর নামেই দেশে প্রায় ২৪০ একর জমি কেনার তথ্যও উঠে এসেছে।
পেশাগত জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক ছিলেন। এরপর ২০২০ সালের এপ্রিলে তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবসরে যান।
র্যাবের ডিজি থাকার সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। একই সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে। সেই অনুসন্ধান চলাকালেই ২০২৪ সালের ৪ মে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

