প্রায় সব খাতেই অস্বাভাবিক ব্যয়, অথচ রাজস্ব আয় নামমাত্র—ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাস্তব চিত্র এটাই। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে নগর দুটি পরিচালনায় এই অমিল সৃষ্টি হয়েছে। ফলস্বরূপ, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্বভার সামলাতে এখন পড়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে।
সংস্থা দুটি আর্থিক সংকটে পড়েছে। নাগরিক সেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে টানাপোড়েনে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়রদের আগ্রহ মূলত উন্নয়ন কাজের টেন্ডারে (দরপত্র) বেশি ছিল। অপ্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত কিছু টেন্ডারের কাজ পরবর্তীতে বাতিল করা হয়েছে।
তবে অস্বাভাবিক ব্যয় এখানেই থেমে নেই। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পরিচালন খরচ মেটাতে ভেঙে ফেলা হয়েছে ২০০ কোটি টাকার স্থাবর আমানত (এফডিআর)। প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন ঐচ্ছিক তহবিল থেকেও কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে ইচ্ছামতো। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকায় সিটি করপোরেশনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য না থাকায় দায়িত্বে থাকা কর্তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
ডিএসসিসির ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য ছিল বিশেষভাবে অস্বাভাবিক। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আয়-ব্যয় সমন্বয়ের পর ৮২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম অর্থবছরে আয়ের চেয়ে ১০২ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে যদিও আয় বাড়লেও ব্যয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০৪ কোটি টাকা হয়েছে। নাগরিক সেবা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এখনই প্রয়োজন কার্যকর সমন্বয় ও স্বচ্ছতা, যা অনিবার্যভাবে নির্বাচিত সরকারের কাঁধে এসে পড়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৩০ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয় করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ৪০৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসসিসির আয় ছিল ৭৯২ কোটি ৩০ লাখ, কিন্তু ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮৯৮ কোটি ২ লাখ টাকায়। আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ ব্যয় ছিল ৯৭৯ কোটি ২১ লাখ, আয় ছিল ১ হাজার ৬১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ সালে ১ হাজার ১৫ কোটি ৯২ লাখ টাকার আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছিল ৯৭০ কোটি ২০ লাখ। ২০২১-২২ সালে আয় ৮৭৯ কোটি ৭০ লাখ, ব্যয় ৮০২ কোটি ৮ লাখ টাকা।
ডিএসসিসির অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে ব্যাংকে রাখা ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) ভেঙে খরচ করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন কার্যক্রম ও ঠিকাদারি বিল পরিশোধেও সংকট দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হবে না। করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীরা বলছেন, তহবিলে অর্থ সংকট থাকায় ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উন্নয়ন কাজের গতি কমেছে। চলতি মাসে ৭৫টি ওয়ার্ডের জন্য ১৫০ কোটি টাকার দরপত্র চললেও পুরোনো কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। নতুন প্রকল্প শুরু হলে সংকট আরও বাড়বে।
ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “সাবেক মেয়র তাপস তার সময়ের তিন বছরের কিছু ঠিকাদারি বিল আটকে রেখেছিলেন। এর আগে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের সময়কার ঠিকাদারের জামানতও জমা ছিল। ৫ আগস্টের পর এসব বিল ও জামানত একসাথে পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত ছয় মাসে আয় হয়েছে ৫৩০ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয়ে খরচ হয়েছে ৩১৫ কোটি, নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন খাতে গেছে ৪১৯ কোটি টাকা। এর ফলে প্রতি মাসে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হচ্ছে।”
কর্মকর্তা আরও জানান, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার জন্য করপোরেশনের এফডিআর থেকে ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে করপোরেশনের ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ তহবিলের টাকা মাত্র ৪৬ কোটি। আপাতত উন্নয়ন খাতে নতুন অর্থ ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত আয়-ব্যয়ের সমন্বয় না হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও সময়মতো দেওয়া যাবে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, “দীর্ঘ ১৭ বছরের মধ্যে সিটি করপোরেশনগুলোর অবস্থা এবং রাজস্ব বাজেটের অবস্থার কারণে আগামীতে যদি শুধু রাজস্ব বাজেটের ওপর ভর করে বেতন দেওয়া হয়, সেটা সম্ভব হবে না। বেতন দেওয়ার জন্য টাকা নেই। পূর্ববর্তী প্রশাসন সব শূন্য করে দিয়ে গেছে। তার ওপর ১৫০০ কোটি টাকার অগ্রিম ওয়ার্ক অর্ডারও দেওয়া হয়েছিল। এখন এই চাপ সামলানো আমাদের দায়িত্ব।”
ঈদের আগে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অন্য খাত থেকে সমন্বয় করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রশাসক জানান, “৪৭০ কোটি টাকার কাজের বিল রয়েছে, কিন্তু সেই টাকা নেই। আন্দোলন, নির্বাচন—এসব কারণে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। কিছু করার জন্য পে-অর্ডার ভাঙতে হতে পারে; তবে আমি চাই না পে-অর্ডার ভাঙতে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বরাদ্দ চেয়েছি, যাতে সিটি করপোরেশন চালানো সহজ হয়। আপাতত এই মাসে অন্য খাত থেকে সমন্বয় করে বেতন-বোনাস দেওয়ার চেষ্টা করছি।”
আবদুস সালাম বলেন, “যদি সিটি করপোরেশনের ব্যয় আয় অনুযায়ী হয়, তাহলে সিটি করপোরেশন দেউলিয়া হবে না। এখন দেউলিয়া হয়নি; তবে রাজস্ব আয় কমে গেছে এবং বাজেট আগেই শেষ হয়ে গেছে। পূর্বে যেসব ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ভিত্তি আছে কি না, আমরা সেগুলো পরীক্ষা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেব।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নিয়েও নানা আলোচনা ও সমালোচনা চলছেই। সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলছে। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার আশীর্বাদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এজাজ তার মেয়াদের শেষ মুহূর্তে ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকার টেন্ডারের ওয়ার্ক অর্ডার দিয়েছিলেন। এখন তদন্ত চলছে, যাতে বোঝা যায় দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোন সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় হয়েছিল ১১৭৭ কোটি টাকা, ব্যয় ছিল ১০৮২ কোটি। পরের অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আয় বেড়ে ১১৭৮ কোটি, কিন্তু ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৩৮ কোটি টাকায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আয় হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা, ব্যয় হয়েছে ৮১১ কোটি। এর মধ্যে প্রশাসকের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে সর্বশেষ দুই অর্থবছরে ১১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসির স্থায়ী আমানতে (এফডিআর) বিনিয়োগ রয়েছে ৮২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ তহবিলে জনতা ব্যাংকে ৩৯৬ কোটি, সোনালী ব্যাংকে ১৩৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকে ৭২ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৮ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৪ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ৭ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১০ কোটি এবং ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ১০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
জামানত তহবিলে সোনালী ব্যাংকে ৩৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকে ২৫ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৭ কোটি এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ৩ কোটি টাকা রয়েছে। শিক্ষা বৃত্তি তহবিলে জনতা ব্যাংকে ২ কোটি ও সোনালী ব্যাংকে ৮ কোটি টাকা আছে। পেনশন তহবিলে (অবসর ভাতা ও সুবিধা) জনতা ব্যাংকে ৫৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিলে সোনালী ব্যাংকে ২০ কোটি এবং জনতা ব্যাংকে ২৭ কোটি টাকা আছে।
সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দাবি করেছেন, তার দায়িত্ব শেষের সময় তিনি একটি সমৃদ্ধ ডিএনসিসি রেখে গেছেন। ফেসবুকে তিনি লেখেন, “আমার এক বছরের মেয়াদের শেষ দিন ১০ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব বুঝিয়ে দিই। সেদিন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৬টি অ্যাকাউন্টে মোট ১ হাজার ২৬০ কোটি ১৫ লাখ ৫১ হাজার ৩১১ টাকা ৬০ পয়সা তহবিলে জমা রেখে একটি সমৃদ্ধ সংস্থা রেখে এসেছি।”
তবে বর্তমান প্রশাসক এই দাবির সঙ্গে মিল রাখছেন না। ডিএনসিসি জানিয়েছে, সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি বিল সাধারণ তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের সময় সাধারণ তহবিলে নগদ স্থিতি ছিল ২৫ কোটি, আর ফিক্সড ডিপোজিট ছিল ৮২৫ কোটি, যা আপৎকালীন দায় মেটানোর জন্য সংরক্ষিত।
ডিএনসিসির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে ১ জুলাই ২০২৫ সাধারণ তহবিলে নগদ স্থিতি ছিল ৫৯৭ কোটি এবং বিভিন্ন তহবিলের ফিক্সড ডিপোজিট ৮২৫ কোটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় ১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। সাবেক প্রশাসক এজাজ ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। ফলে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে নগদ স্থিতি ছিল ৩৩৬ কোটি।
এরপর ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয় ৮২০ কোটি টাকা। ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নগদ স্থিতি দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে খরচ করেছেন ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব গ্রহণের দিন, অর্থাৎ ২৫ ফেব্রুয়ারি, নগদ স্থিতি মাত্র ২৫ কোটি টাকা দেখেন—ডিএনসিসির ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, সাবেক প্রশাসক ফিক্সড ডিপোজিটের ৮২৫ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন নির্দিষ্ট তহবিল—জামানত তহবিল, পেনশন তহবিল, শিক্ষা তহবিল, জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ—সঞ্চয়ী হিসাবের ৪৩৫ কোটি টাকা একত্র করে মোট ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে নগরবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। এতে বর্তমান প্রশাসনও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন।
সাবেক প্রশাসক দায়িত্ব ছাড়ার শেষ দিনে ১০ ফেব্রুয়ারি সাধারণ তহবিলে স্থিতির বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে, প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না তা যাচাই না করে তাড়াহুড়ো করে ৩৬টি বিল অনুমোদন করেছেন। এর ফলে প্রায় ৪২ কোটি টাকা বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “সাবেক প্রশাসক যদি কোনো দুর্নীতি করে থাকেন, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিমধ্যে মামলা করেছে। আমার কাছে কিছু ফাইল এসেছে, যেখানে অনৈতিক কাজ হয়েছে। সেগুলো আলাদা করেছি এবং খতিয়ে দেখছি। আগের প্রশাসক ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা টেন্ডার ও ফান্ড ছাড়ের নির্দেশ দিয়েছেন। কিছু প্রকল্প বাইরেরও ছিল। শুধু টেন্ডারই নয়, ওয়ার্ক অর্ডারও দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ওয়ার্ক অর্ডার বাতিল করার অধিকার আমার নেই, কারণ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে টেন্ডার পেয়েছে। তবে অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া টেন্ডার বাতিল করা সম্ভব। সব টেন্ডার খতিয়ে দেখে তদন্ত কমিটি ব্যবস্থা নেবে। অনিয়মে যদি কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বর্তমান প্রশাসক ইতিমধ্যেই ২৫টি দরপত্র বাতিল করেছেন। সাবেক প্রশাসক দায়িত্ব ছাড়ার আগে বৈধতা দিতে ব্যর্থ হয়ে নিজে পাঁচটি দরপত্র বাতিল করেছিলেন।
চলতি অর্থবছরে সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের নির্দেশে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৫-এর অধীনে ৫৯টি দরপত্র আহ্বান করা হয়। মোট খরচ ছিল ১৫৬ কোটি টাকা। তবে আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই এসব দরপত্র আহ্বান করেছিলেন সাময়িক বরখাস্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসকের আশ্বাস পেয়ে তিনি নিয়ম না মেনে দরপত্র অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতেন।
ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আরিফুর রহমান বলেন, “বাতিল হওয়া দরপত্রগুলোতে প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদনের অভাব ছিল। ৫৯টি দরপত্রের মধ্যে মাত্র কয়েকটির অনুমোদন ছিল, বাকিগুলোতে কোনো অনুমোদন ছিল না। এই দরপত্রগুলো এখন দাপ্তরিক তদন্তের অধীনে রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “প্রকৌশলী চাইলে প্রথমে আর্থিক অনুমোদন নেবেন, তারপর কারিগরি অনুমোদন। কিন্তু এসব দরপত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি। আমরা জানিওনি যে এগুলো হয়েছে।”
যদিও সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ অনুমোদন ছাড়া দরপত্র আহ্বানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “দরপত্র অনুমোদনের আগে আর্থিক ও কারিগরি কমিটি যাচাই-বাছাই করে প্রশাসক অনুমোদন দেন। আমার কাজ শুধু অনুমোদন দেওয়া। যারা আমার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অভিযোগ করছেন, তারা হয়তো ভুল বোঝছেন বা মিথ্যা বলছেন।”
অভিযোগ রয়েছে, এজাজ দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে নিজস্ব সম্পত্তি উন্নয়নের জন্য বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খরচ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ‘স্টেট আইটি’ নামে একটি কোম্পানির কাছ থেকে অভিজ্ঞতা ছাড়াই ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ৩৮০টি ওয়াকিটকি ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া গাবতলী হাটের ইজারায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় দেওয়া হয়, ফলে নগরীর আর্থিক ক্ষতি ৫.৫ কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “সিটি করপোরেশনের প্রতি বছরের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য থাকা উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তহবিল খরচে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছিল না। অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োজনীয় কি না কেউ যাচাই করেনি। এভাবে ব্যয় ও এফডিআর ভাঙার ফলে তহবিল প্রায় শূন্য।”
তিনি আরও বলেন, “তদারকি করা দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, প্রশাসক ও কর্মকর্তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। এত টাকা ব্যয় হলেও নাগরিকরা রাস্তাঘাট, মশানিধন ও ড্রেন ব্যবস্থাপনায় কোনো ভালো সেবা পাননি। সাবেক প্রশাসকদের দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির ঘটনা থাকলে তা তদন্ত করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে।”
ড. আদিল মুহাম্মদ খান উল্লেখ করেন, “অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুর্বল ছিল। প্রশাসক ও জনগণের যোগাযোগও ছিল না। সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময়কার বিতর্কিত প্রকল্পের বিল পরিশোধের আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিট করা উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি।”

