বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এর অংশ হিসেবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে চীনে প্রথম বিদেশি কার্যালয় চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। লক্ষ্য—চীন থেকে সরে আসা বিনিয়োগের একটি অংশ বাংলাদেশে আনা এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতা উৎস পর্যায়েই সমাধান করা।
এই উদ্যোগটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনে শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক উত্তেজনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস—এসব কারণে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চায় বিডা।
বিডা সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত কার্যালয়ে চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান দেবেন এবং ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করবেন। এ বিষয়ে প্রস্তাব ইতোমধ্যে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চীনে এই অফিস চালু করা হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে। তবে এই উদ্যোগে ঠিক কতটা বিনিয়োগ বাড়বে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৮০ দিনের পরিকল্পনায় অবকাঠামো খাতে ১৩টি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক জোন বাস্তবায়ন প্রকল্প। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশে চীনা বিনিয়োগে বড় উল্লম্ফন ঘটবে বলে আশা করছে বিডা।
তবে ব্যবসায়ী মহলের মতে, শুধু বিদেশে কার্যালয় খোলা যথেষ্ট নয়। দেশের ভেতরে সমান্তরাল সংস্কারও জরুরি। তারা বলছেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং ভ্যাট ও শুল্ক নীতিতে ঘনঘন পরিবর্তন না হওয়ার নিশ্চয়তা চান। এসব শর্ত পূরণ করা গেলে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক মহাসচিব আল মামুন মৃধা জানান, প্রায় দেড় বছর আগে থেকেই চীনে বিডার অফিস স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি, সেখানে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর ও চেম্বারের জন্য পৃথক ডেস্ক রাখার সুপারিশও ছিল। এতে ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি, যৌথ বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ-পরবর্তী সহায়তা আরও সহজ হতো বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, যেসব দেশ চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে, সেখানে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির আলোচনা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে, যা পুনরায় শুরু করা প্রয়োজন।
বিডার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বেসরকারি বিদেশি বিনিয়োগে সৌদি আরবের পরেই চীনের অবস্থান। এই সময়ে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে এসেছে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং হংকং থেকে এসেছে ১৭৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ। এর বড় অংশ গেছে টেক্সটাইল ও বস্ত্র খাতে।
২০২৫ সালে তিনটি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে মোট ৩২২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে হোন্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ ২৫০ মিলিয়ন, কিয়াশি গ্রুপ ৪০ মিলিয়ন এবং চায়না ল্যাসো গ্রুপ ৩২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হংকংসহ চীন থেকে বাংলাদেশে মোট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশের মোট এফডিআই স্টক ১৮ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে চীনের অংশ ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

