সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের চেয়ে ভাঙার প্রবণতা এখনো বেশি। প্রক্রিয়াগত জটিলতা, ট্যাক্স রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা এবং সুদের হার কাঠামোর সীমাবদ্ধতায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় অনেকেই আগের মতো সঞ্চয় ধরে রাখতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে ভাঙতে হচ্ছে সঞ্চয়পত্র।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার ১৬১ কোটি টাকার। একই সময়ে গ্রাহকেরা ভেঙেছেন ৯ হাজার ১২ কোটি টাকা। ফলে সরকারকে নিট ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ আসার বদলে এই খাত থেকে অর্থ বেরিয়ে গেছে।
এর আগের মাস ডিসেম্বরে সামান্য ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও জানুয়ারিতে আবার বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৬০৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে নিট বিনিয়োগ ছিল ঋণাত্মক ৭ হাজার ১৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব মিলিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে। ফলে মানুষের আস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সঞ্চয়ের প্রবণতায়।
অন্যদিকে বিকল্প বিনিয়োগ এখন বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এক বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলে সুদহার ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে তা ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। এসব ক্ষেত্রে করের চাপ তুলনামূলক কম। বিনিয়োগের সীমা নেই এবং প্রয়োজনে সহজে বিক্রি করা যায়। ফলে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্র থেকে সরে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক আমানতেও এখন প্রতিযোগিতামূলক সুদ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তা সঞ্চয়পত্রের সমান বা বেশি। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের দীর্ঘমেয়াদি মেয়াদ এবং তাৎক্ষণিক ভাঙানোর সীমাবদ্ধতা অনেককে নিরুৎসাহিত করছে।
চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমান প্রবণতায় এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠছে। গত অর্থবছরেও পুরো বছরজুড়ে নিট বিনিয়োগ ছিল ঋণাত্মক, প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এর আগের দুই অর্থবছরেও একই ধারা বজায় ছিল।
বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ সুদহার ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। পরিবার, পেনশনার, পাঁচ বছর মেয়াদি এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক এই চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছানোয় প্রকৃত মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

