বাংলাদেশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও দেশি তেলের খুচরা দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। ডিলার ও জ্বালানি বিক্রেতারা বলছেন, তাদের কাছে যথেষ্ট স্টক রয়েছে।
তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জনগণকে আতঙ্কিত না হতে এবং হঠাৎ করে জ্বালানি সংগ্রহে না ঝাপিয়ে পড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সময়ে, কিছু ব্যবসায়ী তেল জমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিল। এই অবৈধ স্টক উদ্ধারের জন্য যৌথ বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।
দাম ও সরবরাহের অবস্থা:
গত শুক্রবার জারি করা সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটার প্রতি যথাক্রমে ১০০, ১১২, ১১৬ ও ১২০ টাকা থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করলেও দেশি সরবরাহ চেইন স্থিতিশীল রয়েছে।
শক্তি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (ইএমআরডি)-এর যুগ্ম সচিব মণির হোসেন চৌধুরী জানান, ৩০ মার্চের হিসাব অনুযায়ী দেশের তেলের মোট মজুত ১,৯২,৯১৯ টন। এর মধ্যে ১,২৮,৯৩৯ টন ডিজেল, ৭,৯৪০ টন অকটেন, ১১,৪৩১ টন পেট্রোল ও ৪৪,৬০৯ টন জেট ফুয়েল।
তিনি বলেন, “বর্তমান মজুত ১৫-১৬ দিনের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট।” এপ্রিল মাসে আরও ১,৫০,০০০ টন ডিজেল আগমনের কথা রয়েছে। ডিজেল দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশ দখল করে এবং মূলত সেচ ও গণপরিবহনে ব্যবহৃত হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে শক্তি সাশ্রয়ের পদক্ষেপও বিবেচনা করা হচ্ছে, যেমন সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো এবং অফিস সময় কমানো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কমপক্ষে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালু হবে। ক্যাবিনেট কমিটি বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবে।
অবৈধ তেল অভিযান জোরদার:
দেশের ৬৪ জেলায় ২৪ ঘণ্টায় ৩৯১ অভিযান চালিয়ে ৮৭,৭০০ লিটার অবৈধ তেল জব্দ করা হয়েছে। এই অভিযানে ১৯১টি মামলা দায়ের হয়েছে এবং মোট ৯৩৫,০৭০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
চাঁদপুরে একজনের এক বছরের কারাদণ্ড, সাতক্ষীরায় একজন দুই মাস ও গাজীপুরে একজন এক মাসের সাজা পেয়েছেন। ঢাকা মহানগরীর উত্তরা, গাবতলী ও আমিন বাজারে মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করেছে।
সব পেট্রোল পাম্পে তেল বিক্রয় নজরদারি করতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব অফিসার মোতায়েন করেছে, অন্য জেলায় জেলা কমিশনার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার কর্তৃক নিয়োগ করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলায় ৪৭৯ জন, চট্টগ্রামের ১১ জেলায় ৩৩০ জন, রাজশাহীর ৮ জেলায় ৩৪০ জন, খুলনার ১০ জেলায় ৩০১ জন, রংপুরের ৮ জেলায় ৩৫৬ জন, বরিশালের ৬ জেলায় ৬১ জন, ময়মনসিংহের ৪ জেলায় ১০৪ জন এবং সিলেটের ৪ জেলায় ১৩৫ জন ট্যাগ অফিসার কাজ করছেন। ঢাকা মহানগর এলাকায় ১১৬ জন, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ৬২ জন অফিসার মোতায়েন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক তেল আমদানির উদ্যোগ:
সরকারি ক্রয় কমিটি ০.২৬ মিলিয়ন টন ডিজেল ও কাঁচা তেল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জরুরি ভিত্তিতে আমদানি করার অনুমোদন দিয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি মজুত বাড়ানো এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব থেকে প্রতিরোধ করা হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সভাপতিত্বে কমিটিতে চারটি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে সরাসরি ডিজেল ও কাঁচা তেল কেনা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০০,০০০ টন কাঁচা তেল এবিয়ার ট্রেড ও গ্লোবাল মার্কেটস থেকে সরাসরি কেনা হবে। ১০০,০০০ টন সালফারযুক্ত ডিজেল সরাসরি এক্সন মোবাইল কাজাখস্তান কোম্পানি থেকে আমদানি করা হবে। এছাড়া ৬০,০০০ টন ০.৫ শতাংশ সালফারযুক্ত গ্যাস অয়েল ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি জাপিন কোম্পানি থেকে সরকার-প্রতি-সরকার চুক্তির মাধ্যমে আনা হবে।
বাজারে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ:
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর ও পাম্প মালিকদের সংগঠন বলেছে, দেশে তেলের কোন প্রকৃত ঘাটতি নেই। তবে কিছু ব্যবসায়ীর অবৈধ হোল্ডিংয়ের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
সংগঠনের কনভেনার সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল জানিয়েছেন, “বেশিরভাগ মানুষ, যারা মোটরসাইকেল রাইড-শেয়ারিং করেন, তারা প্যাসেঞ্জার পরিবহন না করে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি করছেন। পরে তারা তেল বা অকটেন খোলা বাজারে বিক্রি করছে বা বোতলে জমা করছে। এর ফলে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।”
তিনি বলেন, সরকার আগের চাহিদার তুলনায় যথাযথ পরিমাণ তেল সরবরাহ করছে। তবে চাহিদা দ্বিগুণ বা ত্রিগুণ হওয়ায় অনেক স্থানে চাপ তৈরি হচ্ছে। “বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তেল হোল্ডিংয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে।”

