দেশে ক্যাশনির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা জানান, এই বিপুল অর্থের বড় অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব, যদি দেশের মানুষ দ্রুত ক্যাশলেস লেনদেনে অভ্যস্ত হতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) মানিকগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়োজনে ‘লেনদেন হচ্ছে ক্যাশলেস, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “নতুন নোট ছাপানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল পুরোপুরি বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। এসব কাঁচামাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত। ফলে কাঁচামালের মূল্য একচেটিয়া এবং দর কষাকষির কোনো সুযোগ থাকে না। প্রয়োজনীয় সময়ে কাঁচামাল না পেলে নোট উৎপাদনে বিলম্ব হয়। এর প্রভাব সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়ে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “প্রতিটি নতুন নোট দেশের প্রায় ১২ হাজার ব্যাংক শাখার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। নোট পরিবহন ও নিরাপত্তার জন্য বিপুল ব্যয় হয়। প্রতিটি শাখায় ক্যাশ বিভাগের জন্য জনবল রাখতে হয়, সার্বক্ষণিক ভল্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত লোক নিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব শাখাতেও এমন প্রচুর জনবল কাজ করছে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।”
সেমিনারে ক্যাশ ব্যবহারের ঝুঁকিও তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, “কাগজের নোট সহজে জীবাণু ছড়াতে পারে। নোট মলিন হলে ব্যবহারকারীর অনীহা দেখা দেয়। রিকশা ভাড়া দিতে গিয়ে চালক নোট নিতে অনিচ্ছুক হন, আবার ভাঙা নোট যাত্রী নেন না। এই অভিজ্ঞতা নগদ অর্থ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে। কোভিড-১৯ মহামারির মতো পরিস্থিতিতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তাই দ্রুত, নিরাপদ ও স্মার্ট পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন।”
সেমিনারে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়। বক্তারা জানান, চীনের মতো বড় অর্থনীতিতে প্রায় ৯৫ শতাংশ লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে হয়। ব্রাজিলে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ এবং ভারতে ৬০ শতাংশ। সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভারতের সঙ্গে মিল থাকায় বাংলাদেশের জন্যও এমন রূপান্তর সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে দেশের ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। অনেক মানুষ এখনো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে অনীহা দেখাচ্ছেন। শিক্ষিত অংশও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে মারচেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) কাটার কারণে আগ্রহ কম। তবে বক্তারা মনে করেন, ডিজিটাল পেমেন্ট থাকলে বিক্রেতার বিক্রি বাড়তে পারে। ক্রেতার কাছে নগদ সীমিত থাকলে অতিরিক্ত পণ্য কেনা সম্ভব নয়, কিন্তু ডিজিটাল সুবিধা থাকলে কেনাকাটা বাড়ে, যা ব্যবসায়ীর লাভজনক।
সেমিনারে জানানো হয়, দেশে ইতোমধ্যে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ছে। বিএফটিএন, আইএফটি, আরটিজিএস ও এনপিএসবি প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের পরিমাণ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরে ফিজিক্যাল লেনদেন ১৩ শতাংশ কমেছে, আর ডিজিটাল লেনদেন ৭ শতাংশ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে ইতিবাচক অগ্রগতি মনে করছেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১-এর পরিচালক আ ন ম মঈনুল কবির। প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত পরিচালক মো. পারওয়েজ আনজাম মুনীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী এবং শাফকাত মতিন।

