দেশে বিভিন্ন খাতে বিপুল সংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও বড় একটি অংশ এখনো মূসক (ভ্যাট) নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। এতে কর ব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে। তারা বলছেন, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে কর পরিশোধ করলেও অনিবন্ধিতদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক্-বাজেট আলোচনায় এই বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসে। গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা তাদের প্রস্তাব ও উদ্বেগ তুলে ধরেন।
আলোচনায় জানানো হয়, দেশে ৪০ হাজারের বেশি সোনার দোকান থাকলেও মূসক নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে মাত্র ৮ হাজার। একইভাবে কয়েক হাজার ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এখনো নিবন্ধন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো কর না দিয়েই পণ্য বা সেবা বিক্রি করছে। ফলে যারা নিয়ম মেনে ভ্যাট দিচ্ছেন, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘জুলুম কর’ হিসেবে উল্লেখ করে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান নিয়ম কার্যকরের দাবি জানান।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) পরিচালক ফাহাদ কামাল বলেন, সোনার দোকানের বড় অংশকে নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। তবে একই সঙ্গে ভ্যাটের হারও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে।
আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জহুরুল আলম বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাট না দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করদাতারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে একটি বিশেষ দল মাঠপর্যায়ে গিয়ে দোকানের বিক্রি পর্যবেক্ষণ করবে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে ভ্যাট নির্ধারণ করা হবে।
বৈঠকে বিভিন্ন খাত থেকে একাধিক প্রস্তাবও দেওয়া হয়। বাংলাদেশ বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারিং সমিতি বোতলজাত পানির দাম ১৫ টাকা নির্ধারণ এবং বিজ্ঞাপন ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানায়, তাদের সংগঠনের বাইরে আরও কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে।
প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোয়াজ্জেম হোসেন চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে, রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি ও সুইটস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের দাবি জানায়।
এ ছাড়া হোটেল ও বার মালিকদের সংগঠন মদের ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক হোটেল খাতের প্রতিনিধিরা আমদানি কোটাও বাড়ানোর দাবি তোলেন। বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোকে একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার দাবিও উঠে আসে আলোচনায়।
ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মতে, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সমতা নিশ্চিত করতে হলে সব খাতের প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা জরুরি। এতে রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতাও নিশ্চিত হবে।

