সরকার চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। একইসঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ২১ এপ্রিলের মধ্যে প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। গত ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্ট চারটি বিভাগ—ভৌত অবকাঠামো, কৃষি পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান, আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো এবং শিল্প ও শক্তি—যৌথভাবে প্রকল্প তালিকা তৈরি ও ব্যয় যৌক্তিকীকরণের কাজ করবে।
বর্তমানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় মোট ১ হাজার ২৬৭টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে বৈঠকে জানানো হয়, এর বড় একটি অংশ নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সভায় উপদেষ্টা নির্দেশ দেন, প্রথমে চলমান প্রকল্পগুলোর ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। এরপর নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইশতেহারের আলোকে কঠোর যাচাই-বাছাই করতে হবে। পাশাপাশি কোন প্রকল্প ইশতেহারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আর কোনটি নয়, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে পরিকল্পনা বিভাগে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।
ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাবর্তন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (বিআইডিএফ) ইশতেহারভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য একটি উপযোগী অর্থনৈতিক মডেল ও পর্যবেক্ষণ কৌশল তৈরি করে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে খসড়া জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সময়সীমার মধ্যে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগকেও (জিইডি) সেক্টরভিত্তিক অ্যাকশন প্ল্যান প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের মানোন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তথ্যের নির্ভুলতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি জরিপ ও জনগণনার পদ্ধতি উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ সূচক নির্ধারণে কাজ করবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি জোরদারে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে (আইএমইডি) নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন এবং ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ এবং অদক্ষ কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এর আগে ৮ মার্চ এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আরেক বৈঠকে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্রুত কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার। পরে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভায় নির্বাচনি ইশতেহারকে জাতীয় প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
সভায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সরকারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর। এ বিষয়ে বিআইডিএস প্রস্তাব করেছে, চলমান প্রকল্পগুলোর কোন অংশ জাতীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে, তা একটি ম্যাট্রিক্স আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে। একইসঙ্গে খাতভিত্তিক কৌশলগত পরিকল্পনারও সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জিইডি সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা দলিল তৈরির পরামর্শ দিয়েছে।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, পরিকল্পনা বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন ও বিআইডিএস যৌথভাবে ইশতেহার পর্যালোচনা করে বাস্তবায়ন কৌশলসহ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ১৫ মার্চের মধ্যে জমা দেবে।

