মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। সেই চাপ ধীরে ধীরে এসে পড়ছে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ওপরও। এমন এক অস্থির বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সামনে আসছে, যা নিয়ে অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে বাড়তি কৌতূহল ও সতর্কতা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার একটি বড় বাজেট প্রণয়নের কাজ করছে। তবে এই প্রক্রিয়া মোটেই সহজ নয়। দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা একসঙ্গে বাজেট প্রণয়নে জটিলতা বাড়িয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে তৈরি জ্বালানিসংকট, প্রত্যাশার তুলনায় কম রাজস্ব আদায় এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি সবকিছু মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট তৈরি করা কঠিন হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয়, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বাড়তে থাকা ঋণের চাপ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব পরিস্থিতির মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জন্য অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। এরই মধ্যে বাজেটকে ঘিরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে, যাতে বাস্তবসম্মত একটি বাজেট প্রণয়ন করা যায়।
এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য থাকবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে থাকছে। তবে বড় বাজেটের সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানোর চাপ থাকায় করের বোঝা বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে পারেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আসন্ন বাজেটের সম্ভাব্য আকার দাঁড়াতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি মোকাবেলায় সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকে আসতে পারে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামো অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ছয় লাখ তেতাল্লিশ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে আসার লক্ষ্য পাঁচ লাখ একাত্তর হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য প্রায় পাঁচ লাখ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা। তবে বিদ্যমান প্রবণতা বিবেচনায় অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই উচ্চ লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে না।
একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে প্রায় দুই লাখ ত্রিশ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় তেইশ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার প্রকল্প বাছাইয়ে কার্যকারিতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে ব্যয়ের ফলপ্রদতা নিশ্চিত করা যায়। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ এবং শিল্পায়নের গতি কমে যেতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন্দ্রীয় নীতি সংলাপ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চাপে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীরগতির রাজস্ব আহরণ, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, কম বিনিয়োগ এবং সীমিত কর্মসংস্থান, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। তার মতে, স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার জোরদার করা জরুরি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় নিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালি বৈশ্বিক তেল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় বাংলাদেশসহ বহু দেশে তেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এই সংঘাতের প্রভাবে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম দশ ডলার বাড়লে দেশে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে দাম একশ তেইশ ডলারের বেশি থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় একুশ হাজার কোটি টাকা।
সরকার আপাতত জ্বালানির দাম না বাড়ানোর অবস্থানে থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ বেড়ে যেতে পারে। এতে বাজেট বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে প্রবাসী আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা প্রবৃদ্ধির উচ্চ লক্ষ্য কিছুটা কমিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
অন্যদিকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারকে একসঙ্গে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এগুলো হলো—পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিজনিত অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামলানো।
রাজস্ব ঘাটতি লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়াতে পারে:
আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরা হচ্ছে রাজস্ব আদায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধারাবাহিকভাবে পূরণ হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি) এনবিআরের শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে সাতেকাশি এক কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেছেন, ‘করের আওতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি সম্ভব নয়। এজন্য এনবিআরের আধুনিকায়ন, স্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধুমাত্র বড় বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না, বরং আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন।’
মূল্যস্ফীতি থেকে মধ্যবিত্তের দুর্ভোগ:
গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, ‘দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুতর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।’
অর্থনীতিবিদরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার স্থিতিশীল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন উল্লেখ করেছেন। তবে তারা সতর্ক করেছেন, যদি জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বাড়ে, তবে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সুদহার কমানো মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
বেসরকারি বিনিয়োগের ধারা হতাশাজনক:

