বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে রেখেছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা সেই লক্ষ্য অর্জনের বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। অথচ আগামী তিন অর্থবছরে এ খাতে বিনিয়োগের যে পূর্বাভাস সরকার দিয়েছে, তা উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশে থাকবে। পরবর্তী দুই বছরেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরে বৃদ্ধি মাত্র শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ পয়েন্ট।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে ছিল। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এ হার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও সংশোধিত হিসাবে তা নেমে এসেছে ২১ দশমিক ২২ শতাংশে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে সরকার একই সময়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগের গতি না বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির এমন উল্লম্ফন বাস্তবে অর্জন করা কঠিন।
তাদের যুক্তি, বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, যখন বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, তখনও প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি স্থায়ীভাবে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বিনিয়োগের হার ২১ শতাংশের ঘরে নেমে আসায় আরও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে দীর্ঘ সময় ধরে ৮ থেকে ৯ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। কিন্তু বিনিয়োগের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সেই লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৮৬ শতাংশই আসে বেসরকারি খাত থেকে। সরকারের অবদান ১৩ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বেসরকারি খাত সক্রিয় না হলে শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
সরকার অবশ্য সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। চলতি অর্থবছরে যেখানে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ, সেখানে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা ১৫ দশমিক ১৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে এ বিনিয়োগের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে এ পরিকল্পনার অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজস্ব আহরণ ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকায় সরকারকে ঋণের ওপর আরও নির্ভর করতে হতে পারে। এতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারি ঋণগ্রহণ বাড়বে এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চীনে বিনিয়োগের হার দীর্ঘ সময় ৪০ শতাংশের ওপরে ছিল। ভারত ও ভিয়েতনামেও তা ৩০ শতাংশের বেশি। তুলনায় বাংলাদেশের মোট বিনিয়োগ বর্তমানে ২৮ থেকে ২৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় কম।
বেসরকারি বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ। সেখানেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বিনিয়োগের আগাম সংকেত পাওয়া যায় ঋণপ্রবাহের মাধ্যমে। বর্তমান চিত্র বলছে, স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
বাংলাদেশ ব্যাংক ভবিষ্যতে মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করার পরিকল্পনা করলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা সেই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। ফলে সুদহার কমলেও ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে প্রয়োজনীয় অর্থ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা ও ব্যবসা না বাড়লে ব্যাপক হারে চাকরি সৃষ্টি সম্ভব নয়। সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প কিছু অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই চাকরির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। অল্পসংখ্যক চাকরির বিপরীতে লাখ লাখ আবেদন জমা পড়ছে, যা কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তির মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়।
সরকার বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে করনীতিতে স্থিতিশীলতা, ব্যবসা সহজীকরণ, বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে শুল্ক সুবিধাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে। কারণ নীতিগত ঘোষণা থেকে শুরু করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, কারখানা স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—প্রতিটি ধাপই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদদের অভিমত, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নয়, বরং বেসরকারি বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ব্যবসা পরিবেশের উন্নয়ন এবং রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর মতো মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি। অন্যথায় কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলেও বাস্তবে সেই গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।

