অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি সংকট শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি খাদ্যসহ সব ধরনের পণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলবে এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি করবে। তিনি সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠতে পারে।
আজ রোববার আগারগাঁওয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উদ্যোগে এবং জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ওএইচআরএলএলএস ও বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয়ের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় মাল্টিস্টেকহোল্ডার কনসালটপশন বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দাম দ্বিগুণ হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ বহন করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।”
অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ নয়। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ দেনার চাপ, উচ্চ সুদের হারে ঋণ গ্রহণের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, সরকার নির্বাচিত হওয়ায় জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকলে এবং সরকারি তহবিল থেকে ধারাবাহিক রক্তক্ষরণ চললে, শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব জনগণের ওপর পড়বে। তাই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হবে। একদিকে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের ওএইচআরএলএলএস সম্প্রতি একটি ‘ইন্ডিপেনডেন্ট গ্র্যাজুয়েশন রিডিনেস এসেসমেন্ট’ সম্পন্ন করেছে। শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি এসেসমেন্টের প্রধান দিকগুলো উপস্থাপনের জন্য অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার মূলত ‘ফায়ার ফাইটিং’ পদ্ধতিতে প্রতিদিন সংকট মোকাবিলা করছে। অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী। সরকারি তহবিলে ধারাবাহিক চাপ বা রক্তক্ষরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি নির্ভরতা—all মিলিয়ে অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “সংকট উত্তরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বা সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিএনপির ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখিত নীতিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় তৈরি হয়েছে। যদি এসব নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন সময়মতো সম্পন্ন হয়, অর্থনীতি ধীরে ধীরে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে এবং গ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতি সম্ভব হবে।”
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে গ্র্যাজুয়েশন স্থগিত বা সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে (প্রায় তিন বছর) অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোকে শক্তিশালী করা হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারলে, ভবিষ্যতে গ্র্যাজুয়েশন একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠবে।
বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভায় উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ওএইচআরএলএলএসের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমা, এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

